Global Header Bottom
আমাদের দেশে গ্লোবাল ব্র্যান্ড তৈরি হয়নি কেন?

পর্ব- ১

আমাদের দেশে গ্লোবাল ব্র্যান্ড তৈরি হয়নি কেন?

আমাদের দেশে গ্লোবাল ব্র্যান্ড তৈরি হয়নি কেন?

আমাদের দেশে লোকাল ব্র্যান্ড বা স্থানীয় ব্র্যান্ডের কোনো কমতি নেই। অন্যভাবে বলা যায় দেশিয় ব্র্যান্ডের কোনো কমতি নেই। কিন্তু আমাদের এমন কোনো ব্র্যান্ড তৈরি হয়নি যে ব্র্যান্ডটিকে আমরা গ্লোবাল ব্র্যান্ড হিসেবে বিবেচনা করতে পারি। কেন সেটা হয়নি তার কারণ অনুসন্ধানের আগে আমরা একটু দেখার চেষ্টা করব বিভিন্ন ইন্ডাস্ট্রিতে আমাদের দেশিয় ব্র্যান্ডের কার্যক্রমগুলো কেমন। প্রথমেই আসা যাক আমাদের তৈরি পোশাকশিল্প প্রসঙ্গে। আমাদের ফ্যাশন ইন্ডাস্ট্রিতে এখন অনেকগুলো ব্র্যান্ড রয়েছে। কোনো কোনো ব্র্যান্ডের সারাদেশে আউটলেট বা শোরুম রয়েছে। কোনো কোনোটি একটি, দুটি বা কয়েকটি শোরুম নিয়ে ব্যবসা করছে। এদের মধ্যে কারও কারও অবস্থান বেশ ভালো। তবে লক্ষণীয় বিষয় হলো ফ্যাশন হাউজগুলোর মধ্যে দু-চারটি বাদ দিয়ে অধিকাংশেরই ব্যাকওয়ার্ড লিংকেজ-এ গার্মেন্টস ফ্যাক্টরি রয়েছে। ফলে ফেব্রিক্স পেতে তাদের কোনো সমস্যা হচ্ছে না। বরং এ কারণে তারা বাড়তি সুবিধা ভোগ করছে। এছাড়া তাদের কাজের অভিজ্ঞতা রয়েছে। দক্ষ মানবসম্পদ রয়েছে। এ সকল কারণে ফ্যাশন ইন্ডাস্ট্রিতে তাদের আগমন সহজ হয়েছে।

“ক্যাটস আই” বাংলাদেশের ফ্যাশন জগতে অতি পরিচিত একটি ব্র্যান্ড। আশির দশকে যাত্রা শুরু করে এখনো মানুষের মনে বেশ ভালোভাবেই টিকে আছে। ছোট্ট পরিসরে যাত্রা শুরু করে বর্তমানে দেশের অনেক জেলায় রয়েছে তাদের শোরুম বা আউটলেট। এরপর সময়ের পরিক্রমায় এবং বাজারের চাহিদার সাথে তাল মিলিয়ে আরও অনেক ব্র্যান্ড বাজারে এসেছে। ইনফিনিটি, সেইলর, টেক্সমার্ট, ইয়েলো, জেন্টেল পার্ক, ফ্রিল্যান্ড, টুয়েলভ সহ আরও বিভিন্ন ব্র্যান্ড বাজারে এসেছে। এর মধ্যে কোনো কোনোটি বাজারে একটা নিজস্ব ইমেজ তৈরি করতে পেরেছে। এই ব্র্যান্ডগুলোর কাস্টমার সংখ্যাও দিন দিন বেড়ে চলেছে। ক্যাটস আই যে সময় যাত্রা শুরু করেছিল ওই সময় এদেশের খুব অল্প সংখ্যক মানুষই ফ্যাশন সচেতন ছিলেন, ফ্যাশন নিয়ে চিন্তা ভাবনা করতেন। তখন প্রযুক্তি এত উন্নত ছিল না। এখনকার মতো চাইলেই পুরো দুনিয়ার খবর নেওয়া যেত না। দিন দুনিয়ার কোথায় কি হচ্ছে তা জানা যেত না। ওই সময় “ক্যাটস আই” এর উদ্যোক্তা রুমী ভাই ফ্যাশন নিয়ে স্বপ্ন দেখতে পেরেছিলেন বলেই তিনি তাঁর ব্র্যান্ড “ক্যাটস আই” গড়ে তোলতে পেরেছিলেন। এখন তাঁর বয়স হয়েছে। পরবর্তী প্রজন্ম ব্যবসার হাল ধরেছেন। কিন্তু তিনি কখনো তাঁর ব্র্যান্ডটিকে দেশের বাইরে নিয়ে যাওয়ার কথা সম্ভবত ভাবেননি। গ্লোবাল ব্র্যান্ড হিসেবে হয়তো স্বপ্ন দেখেননি, চিন্তা করেননি। অথচ তার মধ্যে ডিজাইন ডেভেলপ করার মতো মেধা ছিল। তিনি খুব ভালোভাবে শার্টের কাট কেমন হবে সেটা বুঝতে পারতেন। এদেশের ছেলেদের শার্টের কাট কেমন হলে ভালো ফিটিং হবে এটা তিনি বুঝতে পারতেন। তাঁর ব্র্যান্ড ভালো করার পেছনে এটা ছিল একটি বড় কারণ। তিনি এ দেশের ছেলেদের ফিগারের মাপ খুব ভালো বুঝতেন। এ কারণে তিনি তার শার্টে এমনভাবে ডিজাইন ডেভেলপ করতেন যা এদেশের ফ্যাশন সচেতন ছেলেদের মনে খুব সহজেই জায়গা করে নিয়েছিল। এখনো অনেকে শার্ট কিনতে গেলে “ক্যাটস আই” এর নামটি সবার আগে মনে করেন।

আমাদের দেশের ফ্যাশন হাউজগুলোর স্থানীয় বাজারে ভালো করার পেছনে কারণ রয়েছে। এক সময় তৈরি পোশাকশিল্পের ক্রেতা তথা বায়াররা এদেশে বসে ডিজাইন ডেভেলপ করেছেন। ওই সময় প্রযুক্তি এত উন্নত না থাকার কারণে ক্রেতাদের ডিজাইনাররা কখনো কখনো ডিজাইন ডেভেলপ করে এ দেশে নিয়ে এসেছেন। আবার কখনো এদেশে বসেই ডিজাইন ডেভেলপ করেছেন। ইউরোপ আমেরিকার বিভিন্ন জায়গা থেকে ডিজাইনাররা এদেশে এসে কাজ করেছেন। ফলে তাঁদের সংস্পর্শে থেকে এদেশের তৈরি পোশাকশিল্পের সাথে স¤পৃক্ত ডিজাইনাররা নিজেদের ডেভেলপ করার সুযোগ পেয়েছেন। শেখার সুযোগ পেয়েছেন। দক্ষতা বাড়ানোর সুযোগ পেয়েছেন। আর এখন তো প্রযুক্তির যুগ। প্রযুক্তি মানুষের শেখার সীমানাকে আকাশ সমান উন্মুক্ত করে দিয়েছে। ফলে প্রযুক্তি এবং ইচ্ছাশক্তি এই দুইয়ের সমন্বয়ে সফটওয়্যার ব্যবহার করে একটি ডিজাইন ডেভেলপ করা অথবা একটি ডিজাইনকে পরিবর্তন, পরিমার্জন করে নতুন কোনো ডিজাইন তৈরি করা কঠিন কোনো কাজ নয়। এ সকল কারণে আমাদের তৈরি পোশাকশিল্প যেমন এগিয়েছে, একইভাবে এগিয়েছে আমাদের ফ্যাশন ইন্ডাস্ট্রি। তৈরি পোশাকশিল্পের ডিজাইন তৈরিতে আমাদের দেশের ডিজাইনাররা এখন বেশ ভালো অবস্থানে রয়েছে। তৈরি পোশাকশিল্পে আমাদের আরেকটি বাড়তি সুবিধা হলো শ্রমের সস্তা মূল্য। ফলে আমরা খুব কম খরচে একটি পোশাক তৈরি করতে পারছি। অন্যদিকে যদি সঠিকভাবে মার্কেটিং করা যায়, ব্র্যান্ড ইমেজ তৈরি করা যায়, ব্র্যান্ড ভ্যালু তৈরি করা যায় তাহলে একটি পোশাক দেশের বাজারে তিন গুণ, চার গুণ, কোনো কোনো ক্ষেত্রে পাঁচ গুণ বেশি দামেও বিক্রি করা সম্ভব হচ্ছে। মুনাফার এই লোভনীয় হার অনেক উদ্যোক্তাকে এই ব্যবসায় আসতে উৎসাহিত করেছে, অনুপ্রাণিত করেছে এবং এখনো করছে।

মার্চেন্ডাইজিং এর দুটি অংশ রয়েছে। এর একটি হলো ভিজ্যুয়াল পার্ট এবং আরেকটি ফিজিক্যাল পার্ট। আমরা যদি ভিজ্যুয়াল বিষয়টিকে বিবেচনা করি আর সেখানে এপেক্স এর কোনো শোরুম এর কথা কল্পনা করি তাহলে যেকোনো ক্রেতার মনেই একটি ইতিবাচক অনুভূতি তৈরি হবে। এপেক্স যেভাবে, যে পরিসরে জুতার ডিসপ্লে করছে দুবাই বা ইউরোপের কোনো মার্কেটে গেলেও প্রায় একই দৃশ্য আমরা দেখতে পাবো। অর্থাৎ ভিজ্যুয়াল অংশে আমাদের ডেভেলপমেন্ট যথেষ্ট হয়েছে। তবে সকল ব্র্যান্ড বা সকল পণ্যে এমনটি হয়েছে বলে মনে করার কোনো কারণ নেই। আমাদের আলোচ্য বিষয় দেশে কেন গ্লোবাল ব্র্যান্ড নেই। সেই বিবেচনায় যাদের গ্লোবাল ব্র্যান্ড হওয়ার মতো সামর্থ্য বা যোগ্যতা রয়েছে বলে আমরা মনে করি বা অনেকে মনে করেন, তথাপি নেই কেন সেটা নিয়েই আমাদের এই আলোচনা বা লেখা। এই কথার সূত্র ধরে আমরা যদি এপেক্স এর ভিজ্যুয়াল অংশটি দেখার চেষ্টা করি তাহলে নিঃসন্দেহে মনে হবে এই জায়গাটিতে এপেক্স বেশ ভালো অবস্থানে রয়েছে। কিন্তু গ্লোবাল ব্র্যান্ড হওয়ার মতো অন্য যে উপকরণগুলো প্রয়োজন সেখানে পিছিয়ে রয়েছি।

আমাদের দেশে এফএমসিজি ইন্ডাস্ট্রিতে অত্যন্ত পরিচিত একটি ব্র্যান্ড রয়েছে। এই ব্র্যান্ডটি মূলত সেলস ওরিয়েন্টেড। এই ব্র্যান্ড বিক্রি ছাড়া অন্য কিছুকে অধিক গুরুত্ব দেয় না। যে কোনো মূল্যে বিক্রি ধরে রাখতে হবে, বিক্রির পরিমাণ বাড়াতে হবে এটাই কোম্পানির অন্যতম লক্ষ্য এবং উদ্দেশ্য। এই কোম্পানির পণ্য বিদেশেও প্রচুর বিক্রি হচ্ছে। কিন্তু প্রশ্ন হলো পণ্যের ক্রেতা কারা। এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে গেলে বেরিয়ে আসবে পৃথিবীর যে দেশেই আমাদের দেশের লোকজন আছে তথা আমাদের দেশের কর্মীরা কাজ করছেন সেখানেই এই পণ্য পৌঁছে যাচ্ছে। কারণ কোম্পানি বিশ্বাস করে এবং জানে বিদেশে আমাদের দেশের যত মানুষ রয়েছে তাঁরা এদেশের কোনো পণ্য ওই দেশে পেলে মনস্তাত্ত্বিকভাবে ওই পণ্যের প্রতি দুর্বল হবে এবং পণ্য কিনবে। একইসাথে মনের মধ্যে আত্মতৃপ্তি অনুভব করবে। মনস্তাত্ত্বিক এই বিষয়টি বুঝতে পারার কারণেই পৃথিবীর যে দেশেই এদেশের কর্মীরা কাজ করছেন সেখানেই ওই কোম্পানির পণ্য চলে যাচ্ছে। এখানে একটি প্রশ্ন থেকে যায়, বিদেশে কি শুধু আমাদের দেশের নাগরিকেরাই ওই ব্র্যান্ডের পণ্য কিনছেন, বিদেশিরা কি কিনছেন না। এক্ষেত্রে আমার বক্তব্য হলো বিশে^র বিভিন্ন দেশে বসবাসকারী বন্ধুবান্ধব, আত্মীয়স্বজন এবং অন্যান্য সূত্র থেকে প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী এদেশের নাগরিকেরাই বেশি কিনছেন। ওই দেশের বা ওই দেশে বসবাসকারী অন্যান্য দেশের নাগরিকদের অংশগ্রহণ খুবই কম। এর মূল কারণ প্রতিটি দেশের নাগরিকদের পণ্য কেনার ক্ষেত্রে গুণগতমানের একটি বেঞ্চমার্ক রয়েছে। ক্রেতারা ওই বেঞ্চমার্ক বিবেচনা করেই পণ্য কেনার সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেন। এখানে আরও একটি বিষয় লক্ষণীয় হলো অনেকে মনে করেন এদেশের কোনো ব্র্যান্ডের পণ্য যদি মানগত দিক থেকে ভালো না হয় তাহলে বিদেশে রপ্তানি হয় কিভাবে। এর সহজ উত্তর হলো প্রতিটি দেশে পণ্য প্রবেশের একটি বেঞ্চমার্ক মান রয়েছে। ফলে যে কোনো কোম্পানি বিদেশে পণ্য রপ্তানি করার সময় ওই বেঞ্চমার্ক অনুসরণ করে। কিন্তু এই বেঞ্চমার্ক অনুসরণ করার অর্থ এই নয়, ওই দেশের সকল নাগরিক ওই ব্র্যান্ডের পণ্য কিনবে। ক্রেতারা পণ্য কিনে তাঁদের পছন্দের ব্র্যান্ড থেকে। তাঁদের নিজস্ব বেঞ্চমার্কের মান অনুযায়ী।

মার্কেটিং কনসালট্যান্ট

শেয়ার করুন:

এই ক্যাটাগরির আরও নিবন্ধ

Global Before Footer