পর্ব- ১
বাজারজাতকরণ গবেষণা পদ্ধতি
রিসার্চ ডিজাইন বা গবেষণা নকসাকে বলা হয় গবেষণার প্রাণ। কারণ এটা যদি ঠিক মতো করা যায় তাহলেই গবেষণা থেকে সঠিক ফলাফল পাওয়া সম্ভব। গবেষণা নকসাকে বৃহৎ পরিসরে দু’ভাগে ভাগ করা যায়। এদের মধ্যে একটিকে বলা হয় এক্সপ্লোরেটরি রিসার্চ ডিজাইন বা উদঘাটনমূলক গবেষণা নকসা। অপরটি হলো কনক্লুসিভ রিসার্চ ডিজাইন বা সিদ্ধান্তমূলক গবেষণা নকসা। সিদ্ধান্তমূলক গবেষণা নকসাকে আবার দু’ভাগে ভাগ করা হয়েছে। এদের একটি হলো ডেসক্রিপটিভ রিসার্চ বা বর্ণনামূলক গবেষণা এবং অপরটি হলো কয্যাল রিসার্চ বা কার্যকারণ সম্বন্ধীয় গবেষণা। এক্সপ্লোরেটরি রিসার্চকে কোয়ালিটেটিভ রিসার্চ বা অনুসন্ধানমূলক গবেষণাও বলা হয়। অন্যদিকে কনক্লুসিভ রিসার্চকে কোয়ানটিটেটিভ রিসার্চ বা সিদ্ধান্তমূলক গবেষণা বলে।
অনুসন্ধানমূলক গবেষণা করা হয় কোনো সমস্যার কারণ চিহ্নিত করার জন্য। যদি সমস্যার কারণ আগে থেকে জানা বা বোঝা না যায় সেক্ষেত্রে আমরা অনুসন্ধানমূলক গবেষণা করতে পারি। কোনো বিষয় নিয়ে যদি অস্পষ্টতা থাকে, সমস্যার কারণ জানা না থাকে, সমস্যা নিয়ে যদি দ্বিধাদ্বন্দ্ব থাকে তাহলে সমস্যার মূল কারণ চিহ্নিত করার জন্য গবেষককে অনুসন্ধানমূলক গবেষণা করতে হয়। হতে পারে কোনো কোম্পানির নির্দিষ্ট একটি পণ্যের বিক্রি ধীরে ধীরে কমে যাচ্ছে। বাজারে এমন ঘটনা ঘটতেই পারে। কিন্তু প্রতিষ্ঠান জানে না কেন এমন হচ্ছে। প্রতিযোগি ব্র্যান্ডের আগ্রাসী মার্কেটিং কৌশল, প্রতিযোগির সংখ্যা বৃদ্ধি, ক্রেতাদের রুচির পরিবর্তন, প্রতিযোগি ব্র্যান্ডের প্রচার কৌশল, ক্রেতাদের ক্রয়ক্ষমতা হ্রাস-বৃদ্ধির কারণ সহ নানা কারণে পণ্যের বিক্রি কমতে পারে। প্রতিষ্ঠান যত দ্রুত বিক্রি কমার কারণ নির্ণয় করে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ গ্রহণ করতে পারবে তত তাড়াতাড়ি বাজারে আবার ঘুরে দাঁড়াতে পারবে। কারণ নির্ণয় না করে পদক্ষেপ গ্রহণ করলে সেখান থেকে ভালো ফল পাওয়া সম্ভব নয়। এ কারণে প্রতিষ্ঠানকে সমস্যার আলোকে সমাধানের পথ খুঁজতে হয়। আর মূল সমস্যা খুঁজে বের করার জন্য প্রয়োজন হয় অনুসন্ধানমূলক গবেষণা। এখানে উল্লেখ করা প্রয়োজন এই গবেষণা থেকে শুধু কারণ নির্ণয় করা সম্ভব, সমস্যা সমাধানের পথ দেখানো সম্ভব নয়। সমস্যার কারণ জানার পর সেটা সমাধানে কী পদক্ষেপ নেওয়া প্রয়োজন সেটার জন্য কোয়ানটিটেটিভ রিসার্চ বা সিদ্ধান্তমূলক গবেষণা করতে হবে।
অনুসন্ধানমূলক গবেষণার মাধ্যমে কম সময়ের মধ্যে যে কোনো সমস্যার কারণ নির্ণয় করা যায়। সমস্যার কারণ নির্ণয় করা ছাড়াও গবেষক যদি মনে করেন নতুন কোনো আইডিয়া বা ধারণা ডেভেলপ করা প্রয়োজন সেক্ষেত্রেও এই গবেষণা যথেষ্ট সহায়তা করতে পারে। তবে আমাদের মনে রাখতে হবে এই গবেষণা কোনো সিদ্ধান্ত গ্রহণের জন্য ব্যবহার করা হয় না। শুধু প্রাথমিক সিদ্ধান্ত গ্রহণের জন্য কোয়ালিটেটিভ রিসার্চ বা অনুসন্ধানমূলক গবেষণা করা হয়। যে কোনো বড় গবেষণার জন্য বড় বাজেট প্রয়োজন হয়। অধিক সময় বরাদ্ধ করতে হয়। অনেক বেশি মানবসম্পদের সম্পৃক্ততা প্রয়োজন হয়। কোনো বিষয় নিয়ে বড় ধরনের গবেষণা করে শেষ পর্যন্ত যদি ওটা বাদ দিতে হয় তাহলে প্রচুর অর্থ এবং শ্রমঘন্টা বিফলে যায়। এ কারণে বড় কোনো গবেষণায় হাত দেওয়ার আগে ওই গবেষণার প্রয়োজন আছে কিনা সেটা যাচাই করার জন্য কোয়ালিটেটিভ রিসার্চ বা অনুসন্ধানমূলক গবেষণা করতে হয়। এটাকে অনেকে পাইলট স্ট্যাডিও বলে।
বেশ কয়েক বছর আগের কথা। বিদেশি ব্র্যান্ডের একটি সাবান নিয়ে গবেষণা হয়েছিল। ক্রেতাদের নিকট থেকে অভিযোগ ছিল সাবানের ঘ্রাণ দীর্ঘক্ষণ থাকে না। কিছুদিন ব্যবহার করার পর শক্ত হয়ে যায়। আদ্রতার পরিমাণ বেশি ইত্যাদি। সাবান সম্পর্কে অভিযোগ পাওয়ার পর প্রতিষ্ঠানটি তখন একটি গবেষণা প্রতিষ্ঠানকে অভিযোগগুলো নিয়ে একটি অনুসন্ধানমূলক গবেষণা করার দায়িত্ব দিয়েছিল। গবেষণা প্রতিষ্ঠানটি ছোট একটি স্যাম্পল সাইজ নিয়ে গবেষণা করেছিল। পাশাপাশি ফোকাশ গ্রুপ ডিসকাশনও ছিল। এরপর প্রতিষ্ঠানটি অভিযোগগুলোর সত্যতা খুঁজে পায়। এক্ষেত্রে ওই প্রতিষ্ঠানের সামনে দুটি পথ খোলা ছিল। প্রথমত, প্রতিষ্ঠানটি মনে করতে পারত পুরো দেশে সাবানের বিপুল সংখ্যক ক্রেতার তুলনায় অল্প সংখ্যক ক্রেতা অভিযোগ করেছে। এই অল্প সংখ্যক ক্রেতার অভিযোগের কারণে বাজারে তেমন কোনো প্রভাব পড়বে না। তাই বিষয়টি নিয়ে চিন্তা-ভাবনার প্রয়োজন নেই। আবার প্রতিষ্ঠানটি ভিন্নভাবেও চিন্তা করতে পারত। প্রতিষ্ঠানটি ভাবতে পারত পুরো দেশে তাদের সাবানের অগনিত ক্রেতাদের মনে আরও কোনো অভিযোগ আছে কিনা সেটা যাচাই-বাছাই করে দেখা প্রয়োজন। সেক্ষেত্রে ওই তিনটি অভিযোগ নয়, সাথে আরও অন্যান্য বিষয়ও যুক্ত হতে পারে। সাবানের প্যাকেজিং, ডিজাইন, সাইজ, কালার, প্রাইস, ইত্যাদি বিষয় অন্তর্ভুক্ত করে আরও বড় পরিসরে গবেষণা করা যেতে পারে। সেক্ষেত্রে কোয়ালিটেটিভ রিসার্চ বা অনুসন্ধানমূলক গবেষণার পরিবর্তে কোয়ানটিটেটিভ রিসার্চ বা সিদ্ধান্তমূলক গবেষণা করতে হবে।
অনুসন্ধানমূলক গবেষণাকে অনানুষ্ঠানিক গবেষণাও বলা যেতে পারে। এ ধরনের গবেষণায় সাধারণত কোনো তথ্য-উপাত্ত ব্যবহার করা হয় না। ক্রেতাদের ক্রয় আচরণ, তাঁদের পছন্দ-অপছন্দ, বিশ^াস, মূল্যবোধ, ক্রয়ের ধরন, এ ধরনের নানা বিষয় সম্পর্কে জানার জন্য অনুসন্ধানমূলক গবেষণা করা হয়। এছাড়া কোম্পানির ইমেজ ক্রাইসিস, ইমেজ বিল্ডিং, সম্পর্কে জানার জন্যও অনুসন্ধানমূলক গবেষণা হতে পারে। এক কথায় বলা যায়, কোনো বিষয় সম্পর্কে প্রাথমিক ধারণা লাভের জন্য এ ধরনের গবেষণা করা হয়। এখানে ছোট স্যাম্পল সাইজ ব্যবহার করা হয়। তবে স্যাম্পল সাইজ নির্ভর করবে টোটাল পপুলেশনের ওপর। সাধারণত এ ধরনের গবেষণায় স্যাম্পল সাইজ ছোট আকারেরই হয়ে থাকে। এই গবেষণার ক্ষেত্রে আমাদের এটাও মনে রাখতে হবে এখান থেকে প্রাপ্ত ফলাফল অনেকটাই অনুমান নির্ভর, শতভাগ সঠিক ফলাফল নয়। এ কারণে এখান থেকে প্রাপ্ত ফলাফল নিয়ে কোনো সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা হয় না। এ ধরনের গবেষণার জন্য বিভিন্ন পদ্ধতি ব্যবহার করা হয়। যেমন মাধ্যমিক তথ্য-উপাত্ত ব্যবহার, ফোকাশ গ্রুপ ডিসকাশন, এক্সপেরিয়েন্স সার্ভে বা যাঁরা অভিজ্ঞ তাঁদের ইন্টারভিউ নেওয়া। এছাড়া কেস স্ট্যাডি পদ্ধতি ব্যবহার করা যেতে পারে, পাইলট স্ট্যাডি হতে পারে, গভীর সাক্ষাৎকারও নেওয়া যেতে পারে। মূলত এই পদ্ধতিগুলো ব্যবহার করে অনুসন্ধানমূলক গবেষণাগুলো পরিচালিত হতে দেখা যায়।
(চলবে)
মার্কেটিং বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়