পর্ব- ৯
উদ্যোক্তা উন্নয়ন এবং বাস্তবতা
বিজনেস প্ল্যান এর আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ হলো মার্কেটিং প্রমোশন প্ল্যান নিয়ে যথেষ্ট পরিমাণে কাজ করা। অনেকের কাছে এই প্ল্যান এর কাজগুলো সহজ মনে হলেও বাস্তবে কাজগুলো সহজ নয়। কারণ এই প্ল্যান-এ অনেক টেকনিক্যাল বিষয় বিবেচনায় রাখতে হয়। বিষয়গুলো পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে বিবেচনা করতে না পারলে ছোট ভুলের জন্যও অনেক সময় বড় ধরনের খেসারত দিতে হয়। প্রমোশন প্ল্যান এর বড় অংশ জুড়ে থাকে পণ্য মার্কেটিং করার জন্য প্রমোশন বাজেট তৈরি করা এবং প্রমোশন টুলসগুলোর যথার্থ ব্যবহার নিশ্চিত করা। প্রমোশন টুলসগুলোর মধ্যে রয়েছে এ্যাডভার্টাইজিং, পারসোনাল সেলিং, সেলস প্রমোশন, পাবলিসিটি, পাবলিক রিলেশনস, ডিরেক্ট মার্কেটিং এবং ডিজিটাল মার্কেটিং। আমাদের দেশে অধিকাংশ প্রতিষ্ঠান প্রমোশন খাতে বাজেট বরাদ্ধ করতে চায় না। প্রতিষ্ঠানগুলো এই খাতে অর্থ বরাদ্ধ বা ব্যয়কে অপচয় হিসেবে বিবেচনা করে। অথচ এই ব্যয়কে অপচয় মনে করার কোনো সুযোগ নেই। এই ব্যয়গুলো প্রতিষ্ঠানের জন্য নিরেট বিনিয়োগ। তবে হ্যাঁ, কোনো প্রতিষ্ঠান যদি প্রমোশনের নামে যত্রতত্র অর্থ খরচ করে, কোনো কিছু বিবেচনা না করেই অর্থ ব্যয় করে তাহলে সেটা অপচয় হতেই পারে। মার্কেটার যখন মার্কেটিং সম্পর্কে যথেষ্ট জ্ঞান রাখে না তখন এ ধরনের অপচয় বেশি হয়।
মার্কেটিং প্রমোশনের অন্যতম একটি টুলস হলো বিজ্ঞাপন। বিজ্ঞাপন প্রসঙ্গে আলোচনা করতে গেলে অনেকের কাছেই বিষয়টি খুব সহজ মনে হয়। অনেকেই মনে করে বিজ্ঞাপন তৈরি করে বিভিন্ন মাধ্যমে প্রচার করলেই তো হলো। বিষয়টি আসলে তেমন নয়। আমাদের মনে রাখতে হবে সকল পণ্যের জন্য সকল টুলস সমভাবে প্রযোজ্য নয়। আবার অভিন্ন পণ্য হলেও সকল প্রতিষ্ঠানের জন্য অভিন্ন কৌশলও প্রযোজ্য নয়। টুলস ব্যবহারের সময় পণ্যের ধরন, বাজারের আকার, প্রতিযোগীদের মার্কেটিং কৌশল, প্রতিষ্ঠানের আর্থিক সক্ষমতা এই সবকিছু বিবেচনা করেই প্রমোশন বাজেট এবং টুলস ব্যবহারের বিষয়ে সিদ্ধান্ত নিতে হয়।
ইতিমধ্যে উল্লেখ করেছি প্রমোশন টুলস এর ব্যবহার নির্ভর করে পণ্যের ধরন এবং বাজারের আকারের ওপর। এফএমসিজি ক্যাটাগরির পণ্যের ক্ষেত্রে যে ধরনের প্রমোশন টুলস প্রয়োজন অত্যন্ত দামী গাড়ির জন্য সে ধরনের টুলস কার্যকর হবে না। একটি বিউটি সোপ এর জন্য বিজ্ঞাপন অত্যন্ত কার্যকর একটি টুলস হলেও বিওয়াইডি অথবা বিএমডব্লিউ গাড়ির জন্য আমাদের দেশের প্রেক্ষাপটে বিজ্ঞাপন মোটেই কার্যকর কোনো টুলস নয়। এর কারণ হলো এই দুটি গাড়ির ক্রেতার সংখ্যা বাংলাদেশে অত্যন্ত সীমিত। ফলে কোনো মাধ্যমে বিজ্ঞাপন দিয়ে ক্রেতাদের আকৃষ্ট করা সম্ভব নয়। তাছাড়া বিজ্ঞাপন খাতে ব্যয় মোটেই লাভজনক হবে না। কিন্তু বিউটি সোপ মার্কেটিং করতে গেলে বিজ্ঞাপনের কোনো বিকল্প নেই। এই বিজ্ঞাপন আবার একটি মাধ্যমে দিলে হবে না। বিভিন্ন মাধ্যমে দিতে হবে। টেলিভিশন, পত্রিকা, বিলবোর্ড, সোশ্যাল মিডিয়া, সাইনবোর্ড, ডিজিটাল মিডিয়া কোনো কিছুই বাদ যাবে না। বিজ্ঞাপন শুধু দিলেই হবে না। কোন মাধ্যমে কত টাকা ব্যয় করতে হবে, কিভাবে ব্যয় করতে হবে, কখন ব্যয় করতে হবে এ সম্পর্কে সুস্পষ্ট পরিকল্পনা থাকতে হবে।
আপাতদৃষ্টিতে অনেকের কাছে মনে হতে পারে বিজ্ঞাপন তৈরি এবং তা প্রচারের ব্যবস্থা করা খুব সহজ কাজ। কিন্তু প্রফেশনাল দৃষ্টিভঙ্গি থেকে কাজটি করতে গেলে যথেষ্ট জ্ঞান, বুদ্ধিমত্তা ও বিচক্ষণতার প্রয়োজন রয়েছে। এছাড়া বিজ্ঞাপন একটি সৃজনশীল কাজ হওয়ার কারণে এখানে ষষ্ঠ ইন্দ্রয়র ব্যবহার খুব গুরুত্বপূর্ণ। আমাদের সব সময় মনে রাখতে হবে মার্কেটিংয়ের কাজগুলো আবর্তিত হয় ক্রেতাদের ঘিরে। এ কারণে বিজ্ঞাপন নির্মাণের সময় অনেকগুলো বিষয় বিবেচনায় রাখতে হবে। যদি টেলিভিশনের জন্য বিজ্ঞাপন তৈরি করতে হয় তাহলে প্রথমেই চিন্তা করতে হবে বিজ্ঞাপনের সময়ের ব্যাপ্তি কতক্ষণ হবে। অর্থাৎ কত মিনিট বা কত সেকেন্ডের বিজ্ঞাপন হবে। কারণ টেলিভিশনে বিজ্ঞাপন প্রচারের সময় প্রতি সেকেন্ডের জন্য অর্থ প্রদান করতে হয়। তাই ইচ্ছে থাকলেও অনেক সময় সময়ের ব্যাপ্তি বাড়ানো সম্ভব হয় না। সময় বিবেচনার পাশাপাশি ভাবতে হবে বিজ্ঞাপন কোনো এজেন্সির মাধ্যমে নির্মাণ করা হবে নাকি অন্য কোনো উপায়ে নির্মাণ করা হবে। এছাড়া বিজ্ঞাপনের মডেল কে হবে, শুটিংয়ের লোকেশন কোথায় হবে, বিজ্ঞাপনে কোনো জিংগেল থাকবে কিনা, যদি জিংগেল থাকে তাহলে কন্ঠ কে দিবে, ভয়েজ কে দিবে, জিংগেল কে লিখবে, বিজ্ঞাপনের ডিরেকশন কে দিবে, ইত্যাদি বিষয়গুলো নিয়ে স্পষ্ট কোনো দিকনির্দেশনা না থাকেলে একটি ভালো বিজ্ঞাপন তৈরি করা সম্ভব না। বিজ্ঞাপনের পুরো দায়িত্ব কোনো এজেন্সিকে প্যাকেজ আকারে দেওয়া হবে নাকি কাজের কিছু অংশ নিজস্ব ব্যবস্থাপনায় করা হবে এ ধরনের প্রশ্নগুলোর উত্তর প্রমোশন প্ল্যান-এ থাকতে হবে। প্ল্যান-এ যে বিষয়গুলো বিবেচনা করা হচ্ছে সেগুলো বাস্তবায়ন করার জন্য বাজেট আছে কিনা সেটাও বিবেচনায় রাখতে হবে। কারণ অনেক সুন্দর প্ল্যান করার পর তা যদি বাস্তবায়ন করা না যায় তাহলে ওই প্ল্যান অর্থহীন হয়ে পড়বে।
বিজনেস প্ল্যান এর প্রতিটি দিক নিখুঁত হওয়া বাঞ্চণীয়। বিশেষ করে মার্কেটিং প্ল্যান এর প্রতিটি অংশ নিখুঁত হতে হবে। কারণ মার্কেটিংয়ের ছোট একটি ভুলও কখনো কখনো বড় ধরনের ক্ষতির কারণ হয়ে দেখা দিতে পারে। এ ধরনের দৃষ্টান্ত আমাদের দেশের অনেক প্রতিষ্ঠানের ক্ষেত্রেই ঘটছে। প্রতিযোগীতামূলক বাজারে ভুল করার সুযোগ খুব কম। প্রতিষ্ঠানের ছোট একটি ভুলও প্রতিযোগী প্রতিষ্ঠানের জন্য অনেক বড় ধরনের সুযোগ তৈরি করে দিতে পারে।
(চলবে)
চেয়ারম্যান, মার্কেটিং বিভাগ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়