কানাডা থেকে
ব্যাংকের ব্র্যান্ডিং: আমার যত অভিজ্ঞতা
পর্ব- ১৯
সিটি থেকে স্ট্যান্ডার্ড চার্টার্ড ব্যাংকে
ব্র্যান্ডিংয়ের কাজ করার সময় ব্র্যান্ড ফিলোসফি ভাবনাটিকে মাথায় রেখে কাজ করতে হয়। একটি প্রতিষ্ঠানের ব্র্যান্ড ফিলোসফি ওই প্রতিষ্ঠান সম্পর্কে ধারণা পেতে সহায়তা করে। স্ট্যান্ডার্ড চার্টার্ড ব্যাংকে কাজ করার সময় বরাবরই আমরা এই বিষয়টি মাথায় রেখে কাজ করেছি। অপ্রিয় হলেও সত্য অনেক সময় এই ব্র্যান্ড ফিলোসফি সকলে ধারণ করে কাজ করতে পারে না। আমি যদি ওই ব্যাংকের কাজের কথাই উল্লেখ করি তাহলে এখনও মনে পড়ে তখন আমরা “হেয়ার ফর গুড” এই ট্যাগলাইনকে সামনে রেখে সামগ্রিক কাজগুলো করেছিলাম। ওই ট্যাগলাইনের মূল কথা ছিল স্ট্যান্ডার্ড চার্টার্ড ব্যাংক মানেই ক্রেতাদের জন্য ভালো, কমিউনিটির জন্য ভালো, প্রতিষ্ঠানের জন্য ভালো, দেশের জন্য ভালো এবং দেশের অর্থনীতির জন্য ভালো। এক কথায় সবকিছুর জন্য ভালো। স্ট্যান্ডার্ড চার্টার্ড ব্যাংকে ব্যাংকিং করা মানেই তাঁর জন্য সেটা ভালো। এই ব্যাংক যে দেশেই ব্যবসা পরিচালনা করুক না কেন সেই দেশের সবকিছুর জন্যই ভালো।
ওই ট্যাগলাইনের আলোকে ক্যাম্পেইন করার সময় স্থানীয় ঐতিহ্যকে ধারণ করে কাজ করার কথা ছিল। কিন্তু আমরা যখন ওই ক্যাম্পেইনের জন্য প্রয়োজনীয় ছবি নিয়ে আলাপ করছিলাম তখন আমাকে বলা হলো ইন্ডিয়ান ছবি ব্যবহার করার জন্য। ইন্ডিয়ার কেরালার কিছু ছবি আমাদের দেখানো হলো। আমি আপত্তি করলাম। কারণ ইন্ডিয়ার মানুষ মানে বাংলাদেশের মানুষ না। আমি আমার দেশের ক্যাম্পেইনে কেন ইন্ডিয়ার মানুষের ছবি ব্যবহার করব। আমি তাঁদের বোঝাতে চেষ্টা করলাম আমাকে স্থানীয় সংস্কৃতিকে ধারণ করার কথা বলা হয়েছে। অথচ ছবি বেছে নেব ইন্ডিয়ার মানুষের এটা হতে পারে না। দুঃখজনক বিষয় হলো তখন আমার সাথে কয়েকজন সহকর্মীও ইন্ডিয়ার কেরালার মেয়েদের ছবির প্রতি সম্মতি দিয়েছিল। ওরা বুঝতে পারেনি ইন্ডিয়ার কারও ছবি দিয়ে আমার দেশের মানুষের প্রতিনিধিত্ব করা যাবে না। আমি আপত্তি করার পর ওরা আমাকে একটি মেইল পাঠিয়েছিল। মেইলে উল্লেখ ছিল কেরালার মেয়েদের ছবি ব্যবহার করার জন্য আগে থেকেই সিদ্ধান্ত ছিল। আমি তখন আবার আপত্তি করি এবং তাঁদেরকে বলি আমাকে এ কাজের জন্য নতুন নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। অতএব আমরা যেটা গ্রহণযোগ্য মনে করব সেভাবেই কাজ করব। শেষ পর্যন্ত তাঁরা আমাদের কথাই মেনে নিয়েছিল। আমি বারবার যুক্তি দেখাচ্ছিলাম আমাদের দেশের মেয়েরা শ্যামবর্ণ হতে পারে। কালো হতে পারে। কিন্তু চেহারার আদল সেটা কেরালার সাথে মিলে না। সর্বোপরি আমি আমার দেশের মেয়েদেরকে নিয়েই কাজ করতে চাই। তখন ওরা আপত্তি করল অনেক টাকা খরচ হবে এই যুক্তিতে। আমি তখন বোঝালাম বাংলাদেশ দুবাই, সিঙ্গাপুর বা ইন্ডিয়া না। ওই সকল দেশের মতো খরচ এখানে হবে না। এখানে কম বাজেটে ভালো ফটোশুট করা যাবে। তখন আরও যুক্তি দেখালাম তোমরা দুবাই, নাইজেরিয়া, ইন্ডিয়াকে নিজেদের দেশকে প্রতিনিধিত্ব করার সুযোগ দিলে আমাদের দিবে না কেন। তোমার ব্র্যান্ড ফিলোসফি স্থানীয়করণকে উৎসাহিত করেছ। সেক্ষেত্রে আমি কেন অন্য দেশের ওপর নির্ভর করব। শেষ পর্যন্ত ওরা আমার প্রস্তাব মেনে নেয়।
ঠিক ওই সময় আমরা প্রায়োরিটি ব্যাংকিং লঞ্চিং করার আয়োজন করছিলাম। এর জন্য মডেল খুঁজতে শুরু করি। প্রায়োরিটি ব্যাংকিং মানে ওই শ্রেণির মানুষের জন্য ব্যাংকিং যাঁরা সমাজের উচ্চশ্রেণিকে প্রতিনিধিত্ব করে। আমি এমন ব্যক্তিদের খুঁজতে শুরু করলাম যাঁদের চেহারার মধ্যে একটি বনেদি ভাব আছে। এরকম দুজনকে খুঁজে বের করলাম। আবার দুইজনকে আমাদের অফিস কলিগদের মধ্য থেকেও বেছে নিলাম। তাঁদের চেহারার মধ্যেও বনেদি ভাব ছিল। তাঁদের নিয়ে আমরা স্টিল ফটোগ্রাফি করলাম। রেডিসন হোটেলে একটি প্রোগ্রাম করে আমরা প্রায়োরিটি ব্যাংকিংয়ের লঞ্চিং প্রোগ্রামটি করেছিলাম। যেদিন প্রোগ্রামটি করেছিলাম ওই একই দিন বিভিন্ন পত্রিকায় ওই স্টিল ছবিগুলো ছাপা হয়েছিল। আবার ওই একই ছবির ব্যক্তিদের দিয়ে লাইভ দেখিয়ে অনুষ্ঠানটির পরিসমাপ্তি করেছিলাম। স্ট্যান্ডার্ড চার্টার্ড ব্যাংকে কাজ করার সময় আরও অনেক ছোটখাটো কাজ আমরা করেছিলাম যেগুলো হয়তো অনেকে তখন দেখেনি বা জানতেও পারেনি। কিন্তু ওই কাজগুলোর দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব ছিল অনেক বেশি।
(চলবে)
আফতাব মাহমুদ খুরশিদ কর্পোরেট জগতে অতি পরিচিত নাম| অনেকের কাছে তিনি পরিচিত ব্র্যান্ড ক্যাটালিস্ট হিসেবে| ২০০৭ সালে তিনি পেয়েছেন ব্র্যান্ড লিডারশিপ অ্যাওয়ার্ড| ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ফাইন্যান্স অ্যান্ড ব্যাংকিং ডিপার্টমেন্ট থেকে অনার্স ও মাস্টার্স ডিগ্রি নিয়েছেন| অতপর যুক্তরাজ্য থেকে মার্কেটিংয়ে এমবিএ| দেশের বিভিন্ন বিখ্যাত প্রতিষ্ঠান ছাড়াও বহুজাতিক কোম্পানিতে গুরুত্বপূর্ণ পদে কাজ করার দীর্ঘদিনের অভিজ্ঞতা রয়েছে তাঁর| স্ট্যান্ডার্ড চার্টার্ড, সিমেন্স, এসিআই, বাংলালায়ন, রেডিও টুডে, প্রাইড, ট্রাস্ট ব্যাংক, বেঙ্গল গ্রুপ, অ্যাপোলো হাসপাতাল, এসএসজি, সিটি ব্যাংকসহ আরও বেশ কিছু প্রতিষ্ঠানে তিনি কাজ করেছেন| এছাড়া দেশে-বিদেশে ব্র্যান্ড সম্পর্কিত বিভিন্ন কনফারেন্সে যোগদান করেছেন, বক্তব্য দিয়েছেন|