Global Header Bottom
বিশ্ববাণিজ্য দ্রুতই বদলে যাচ্ছে আমাদেরও প্রস্তুত হতে হবে

সুইডেন থেকে

বিশ্ববাণিজ্য দ্রুতই বদলে যাচ্ছে আমাদেরও প্রস্তুত হতে হবে

বিশ্ববাণিজ্য দ্রুতই বদলে যাচ্ছে  আমাদেরও প্রস্তুত হতে হবে

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের মার্কেটিং বিভাগ থেকে বিবিএ শেষ করে কর্পোরেট জগতে প্রবেশ করি। প্রথমে নেসলে বাংলাদেশ লিমিটেড, তারপর কাজ করেছি প্রাণ ফুডস, এবং সর্বশেষ ছয় বছর আর্লা ফুডস বাংলাদেশ লিমিটেড-এ। প্রায় ১০ বছরের কর্মজীবনে কাজ করেছি সেলস এবং মার্কেটিংয়ের বিভিন্ন পজিশনে।

অতীতের যেকোনো সময়ের তুলনায় বর্তমানে আমরা অনেক গতিশীল পর্যায়ে আছি। রাজনৈতিক এবং অর্থনৈতিক প্রেক্ষাপট বদলে যাচ্ছে খুবই দ্রুত। কর্পোরেট অঙ্গনে এ পরিবর্তনের প্রভাব আরও ব্যাপক। তথ্যপ্রযুক্তির প্রভাবে প্রক্রিয়াজাতকরণ এবং বাজারজাতকরণ কৌশলে পরিবর্তন আসছে প্রতিনিয়ত। গতিশীল ও পরিবর্তনশীল এই কর্পোরেট অঙ্গনে নেতৃত্ব বজায় রাখতে, ক্রমাগত নিজেকে আপডেট রাখা আমার কাছে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ মনে হয়েছে সব সময়। ব্যবসায় প্রশাসনের যুগোপযোগী কিছু বিষয়ে আরও গভীরভাবে পড়ালেখা করার ইচ্ছা আমার বরাবরই ছিল। এরই ধারাবাহিকতায় আমি সুইডেনে স্কলারশিপের জন্য আবেদন করি। অতঃপর তীব্র প্রতিযোগিতামূলক একটি প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে সুইডিশ সরকারের স্কলারশিপের জন্য আমি মনোনীত হই। আমার পূর্ববর্তী অভিজ্ঞতা এবং ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা অনুযায়ী আমি হামস্টাড ইউনিভার্সিটিতে “স্ট্র্যাটেজিক এন্টারপ্রিনিউরশিপ ফর ইন্টারন্যাশনাল গ্রোথ- স্পেশিয়ালাইজিং ইন স্ট্র্যাটেজিক লিডারশিপ” এ মাস্টার্স কোর্সে অন্তর্ভুক্ত হই। তীব্র প্রতিযোগিতার কথা বলছি এ কারণে, স্কলারশিপটি মূলত কর্পোরেট প্রফেশনালদের জন্য যাঁদের উল্লেখযোগ্য ব্যবসায়ীক অথবা প্রশাসনিক অভিজ্ঞতা আছে। তাই আবেদনের যোগ্যতা অনুযায়ী পৃথিবীজুড়ে কর্পোরেট প্রফেশনালরা এই স্কলারশিপের জন্য প্রতিযোগিতা করে থাকেন প্রতিবছর। এক্ষেত্রে শুধু বিজনেস গ্র্যাজুয়েটরাই আবেদন করেন না বরং শিক্ষক, ডাক্তার, ইঞ্জিনিয়ার, অর্থনীতিবিদ সহ অন্যান্য পেশার কর্মী যাঁরা ইতোমধ্যে লিডারশীপ রোল পালন করেছেন তাঁরাও আবেদন করেন।

পৃথিবীর পরিবর্তনশীল প্রেক্ষাপটে দ্রুত বদলে যাচ্ছে নেতৃত্ব ও ব্যবস্থাপনার ধরন। গতানুগতিক ব্যবস্থাপনা থেকে ব্যবসায় সম্প্রসারণ করার সুযোগ খুব দ্রুত কমে আসছে। এখন উদ্ভাবনী উদ্যোগ নিয়ে এগিয়ে যাওয়াটা অবশ্যম্ভাবী হয়ে দাঁড়িয়েছে। মুনাফা অর্জনের সাথে সাথে সামাজিক ও পরিবেশগত উন্নয়ন সাধন করাটাও ব্যবসার অন্যতম লক্ষ্য এবং উদ্দেশ্য হয়ে দাঁড়িয়েছে। পুরো পৃথিবীকে এখন আখ্যায়িত করা হয় গ্লোবাল ভিলেজ হিসেবে। মুক্তবাজার অর্থনীতির কারণে পৃথিবীর সকল প্রান্তে সকল ব্যবসা হয়ে উঠেছে প্রচন্ড প্রতিযোগিতাপূর্ণ। তাই বহু বছরের পুরোনো প্রবাদ “সারভাইবল অব দ্য ফিটেস্ট”- এখন আরও বেশি অর্থবহ হয়ে উঠেছে। এ ধরনের প্রতিযোগিতাপূর্ণ পরিবেশে ব্যবসা সম্প্রসারণে প্রয়োজন মেধাসম্পন্ন এবং কৌশলগত নেতৃত্ব। বিশ্বের উন্নত দেশগুলো এই বাস্তবতা আরও অনেক আগে থেকেই উপলব্ধি করতে পেরেছে। ভবিষ্যতের চাহিদাকে সামনে রেখে তাদের শিক্ষা কার্যক্রমে চলে এসেছে আমূল পরিবর্তন। চাহিদার সাথে তাল মিলিয়ে বিশ্ববিদ্যালয়গুলো একসাথে কাজ করছে কর্পোরেট প্রতিষ্ঠানগুলোর সাথে। তাদের গবেষণায়ও চলে এসেছে যুগোপযোগী পরিবর্তন।

জাতিসংঘ এসডিজি তথা সাসটেইনেবল ডেভেলপমেন্ট গোলস এর জন্য ইতোমধ্যে ১৭টি লক্ষ্য নির্ধারণ করেছে। লক্ষ্যগুলো হলো নো প্রোভার্টি; জিরো হাঙ্গার; গুড হেলথ অ্যান্ড ওয়েলবিং; কোয়ালিটি এডুকেশন; জেন্ডার ইকোয়ালিটি; ক্লিন ওয়াটার অ্যান্ড স্যানিটেশন; অ্যাফোরড্যাবল অ্যান্ড ক্লিন এনার্জি; ডিসেন্ট ওয়ার্ক অ্যান্ড ইকোনোমিক গ্রোথ; ইন্ডাস্ট্রি, ইনোভেশন অ্যান্ড ইনফ্রাস্ট্রাকচার; রিডিউস্টড ইনইকোয়ালিটিস; সাসটেইনেবল সিটিস অ্যান্ড কমিউনিটিস; রেসপনসিবল কনজাম্পশন অ্যান্ড প্রোডাকশন; ক্লাইমেট অ্যাকশন; লাইফ বিলো ওয়াটার; লাইফ অন ল্যান্ড; পিস অ্যান্ড জাস্টিস স্ট্রং ইন্সটিটিউশনস এবং পার্টনারশিপস ফর দ্য গোলস। ২০৩০ সালের মধ্যে এই লক্ষ্য পূরণে বিশ^ব্যাপি বিভিন্ন দেশগুলো কাজ করছে। সাসটেইনেবিলিটি নিয়ে উন্নত দেশগুলো অনেকটাই এগিয়ে আছে। অন্যান্য দেশগুলোর লক্ষ্য পূরণের সহায়তা করার জন্য তারা উদাহরণ তৈরি করে চলছে।

গ্লোবাল সাসটেইনেবল ডেভেলপমেন্ট গোলস এর তিনটি ক্ষেত্রে আমি মনোযোগ দিতে চাই। লক্ষ্য তিনটি হলো জিরো হাঙ্গার, গুড হেলথ অ্যান্ড ওয়েলবিং এবং রেসপনসিবল কনজাম্পশন অ্যান্ড প্রোডাকশন। বাংলাদেশ ১৭টি লক্ষ্য পূরণেই অবিরাম কাজ করে চলেছে। ইতোমধ্যে অনেক ক্ষেত্রেই আমাদের অগ্রগতি বেশ ভালো। আমি যে বিষয় নিয়ে এখানে পড়ালেখা করছি তাতে উল্লেখিত তিনটি ক্ষেত্রে আমার জ্ঞান বেশ ভালোভাবেই কাজে লাগাতে পারব বলে আমি বিশ^াস করি। সাস্টেইনেবিলিটি অর্জনে সরকারের কর্মপরিকল্পনার ভূমিকা সবসময়ই অগ্রগণ্য। আমাদের দেশের প্রেক্ষাপটে বেসরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোর ভূমিকাও মুখ্য হয়ে দাঁড়াবে। কারণ, আমাদের দেশে যত পণ্য প্রস্তুত হয় তার প্রায় সিংহভাগই বেসরকারি ব্যবস্থাপনায় প্রস্তুত করা হয়। সরকার এক্ষেত্রে নিয়ম-কানুন বা গাইডলাইন তৈরি করে দিতে পারে। কিন্তু তা বাস্তবায়নের দায়িত্ব বেসরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোর। আমাদের দেশে যে সকল বহুজাতিক প্রতিষ্ঠান রয়েছে তাদের পণ্য প্রস্তুত নিয়ে অভিযোগ করার সুযোগ কম। এই প্রতিষ্ঠানগুলো অনেক সচেতনভাবেই তাদের কাজগুলো সম্পন্ন করে। কিন্তু দেশি অনেক প্রতিষ্ঠানেই রেসপনসিবল কনজাম্পশন অ্যান্ড প্রোডাকশন এর মতো লক্ষ্য পূরণে আরও কাজ করার সুযোগ রয়েছে।

ইতোমধ্যে উল্লেখ করেছি বদলে যাচ্ছে পৃথিবী। পরিবর্তনগুলো কিভাবে হচ্ছে, দীর্ঘমেয়াদী পরিবর্তনের ধারাগুলো কেমন হবে- এসবই আমার দুই বছরের পাঠ পরিকল্পনার অংশ। উন্নত বিশে^র দেশগুলো এই পরিবর্তনের সাথে নিজেদের মানিয়ে নেওয়ার জন্য প্রতিটি ক্ষেত্রে যেভাবে উদ্যোগ গ্রহণ করে এগিয়ে যাচ্ছে তার সাথে যদি আমাদের অবস্থা বিবেচনা করি তাহলে বলতে হয় অনেক প্রতিষ্ঠানই এ ধরনের চিন্তাভাবনার সাথে এখনো পরিচিত নয়। অথচ এই পরিবর্তনের সাথে নিজেদের খাপ খাওয়াতে না পারলে আগামীতে ব্যবসা জগত থেকে ছিটকে পড়তে হবে। এখন স্টার্টআপ ব্যবসায়ের প্রতি উদ্যোক্তাদের আগ্রহ বাড়ছে। সামনে আরও নিত্যনতুন ধারণা নিয়ে ব্যবসা করতে হবে। প্রযুক্তিনির্ভর ব্যবসা আগামীতে আরও প্রসার লাভ করবে। ফলে বিশে^র সাথে তাল মিলিয়ে চলতে হলে এই পরিবর্তনগুলো সম্পর্কে স্বচ্ছ ধারণা রাখতেই হবে। বদলে যাওয়া বিশে^র সাথে তাল মেলাতে হলে কেমন উদ্যোগ প্রয়োজন আর ওই উদ্যোগের নেতৃত্বই বা কেমন হওয়া প্রয়োজন তা নিয়ে এখনই ভাবতে হবে। অন্যথায় অনেক সম্ভাবনার পরেও আমাদের পেছনেই পড়ে থাকতে হবে।

শেয়ার করুন:

এই ক্যাটাগরির আরও নিবন্ধ

Global Before Footer