এ্যামপ্লয়ী টার্নওভার: যখন ক্ষতির কারণ
এ্যামপ্লয়ী টার্নওভার বা কর্মীর চাকরি ছেড়ে চলে যাওয়া সাম্প্রতিক বছরগুলোর আলোচিত বিষয়গুলোর একটি। একজন কর্মী সারাজীবন একই প্রতিষ্ঠানে কাজ করবে এমনটি নাও হতে পারে। বিশেষকরে করপোরেট জগতে এমন দৃষ্টান্ত খুব কমই চোখে পড়ে। কর্মীরা প্রতিষ্ঠান পরিবর্তন করবে এটাই স্বাভাবিক। একজন কর্মী বিভিন্ন কারণে প্রতিষ্ঠান বদল করতে পারে। দীর্ঘদিন একই প্রতিষ্ঠানে চাকরি করার ফলে কাজের মধ্যে বৈচিত্র্যের অভাব অনুভব করতে পারে। কেউ আবার অধিক সুবিধা ভোগের জন্য প্রতিষ্ঠান বদল করতে পারে। কারও ইচ্ছা হতে পারে ট্র্যাক পরিবর্তনের। দীর্ঘদিন কাজ করেছে এফএমসিজি সেক্টরে। এখন তাঁর ইচ্ছে হতে পারে সার্ভিস ওরিয়েন্টেড সেক্টরে কাজ করার। এ কারণেও কর্মস্থল পরিবর্তন করতে পারে। অনেকে যাতায়াতের বিষয়টি মনে করেও অফিস পরিবর্তনের কথা ভাবতে পারে। কারও মনে হতে পারে তাঁর মেধা ও অভিজ্ঞতা শুধু একটি প্রতিষ্ঠানে ব্যবহার হবে কেন। বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানকে তিনি সেবা দিতে ইচ্ছুক। এই ভাবনা থেকেও কর্মস্থল পরিবর্তন করতে পারে। অর্থাৎ, কর্মী প্রতিষ্ঠান বদল করবে এটাই স্বাভাবিক। তাছাড়া চাকরি ছাড়তে হলেও যোগ্যতার প্রয়োজন। একজন যোগ্যকর্মীকেই আরেকটি প্রতিষ্ঠান অধিক সুবিধা প্রদান করে নিতে আগ্রহী হয়। তাই যোগ্যতার প্রমাণ দেওয়ার জন্যও কর্মীরা প্রতিষ্ঠান ছাড়তে পারে, ত্যাগ করতে পারে। তবে তার একটি কাম্য মাত্রা থাকা উচিত। একই প্রতিষ্ঠান থেকে যদি প্রতিনিয়ত কর্মী চলে যায় তাহলে তা ভেবে দেখার প্রয়োজনীয়তা দাবী করে। কারণ, কোনো যোগ্যকর্মী চাকরি ছেড়ে চলে গেলে প্রতিষ্ঠানেরই ক্ষতি হয়।
প্রতিষ্ঠান যখন কোনো কর্মীকে নিয়োগ দেয় তখন ওই কর্মী ফ্রেস হলে তাঁকে গড়ে নিতে সময় লাগে। প্রতিষ্ঠানকে তাঁর পেছনে অনেক অর্থ ব্যয় করতে হয়। সময় ব্যয় করতে হয়। তাঁকে কাজ শেখাতে হয়। প্রশিক্ষণ দিতে হয়। তাঁকে দক্ষ ও যোগ্য করে নিতে হয়। কিন্তু কয়েক বছরের মধ্যেই যদি ওই কর্মী প্রতিষ্ঠান ছেড়ে চলে যায় তাহলে তা প্রতিষ্ঠানের জন্য লোকসান ছাড়া অন্যকিছু নয়। প্রতিষ্ঠানের জন্য অপরিহার্য পুরোনো কোনো কর্মীও যদি চলে যায় তাহলেও প্রতিষ্ঠানের জন্য ক্ষতিকর। গুরুত্বপূর্ণ পদে কর্মরত কোনো কর্মী চলে গেলেও প্রতিষ্ঠানের জন্য ক্ষতিকর। ব্যবসার সাফল্য কোনো একক বিষয়ের ওপর নির্ভর করে না। এখানে ভিশন, মিশন, পলিসি, ডিসিশন, হিউম্যান রিসোর্সেস সবকিছুই বিবেচ্য বিষয়। তবে ব্যবসায়িক সাফল্যের পেছনে সিদ্ধান্ত গ্রহণ অনেক বড় নিয়ামক শক্তি হিসেবে কাজ করে। সিদ্ধান্ত সঠিক হলে সফলতা সহজেই ধরা দেয়। এই সিদ্ধান্ত নির্ভর করে তথ্য অর্থাৎ ইনফরমেশনের ওপর। তাই একদিকে প্রতিষ্ঠানগুলো নিজের অফিসের তথ্যের গোপনীয়তা বজায় রাখার চেষ্টা করে। আবার অন্যদিকে প্রতিযোগি প্রতিষ্ঠানের বিভিন্ন তথ্য জানার চেষ্টা করে। উন্নত বিশ্বের প্রতিষ্ঠানগুলো প্রতিযোগি প্রতিষ্ঠানের তথ্য জানার জন্য প্রচুর অর্থ ব্যয় করে। কিন্তু কোনো প্রতিষ্ঠানের কর্মীরা যদি হরহামেশা প্রতিষ্ঠান ত্যাগ করে তাহলে প্রতিষ্ঠানের ব্যবসায়িক বিষয়গুলোর গোপনীয়তা বলে আর কিছু থাকে না।
এখন প্রশ্ন হলো কর্মীরা প্রতিষ্ঠান ত্যাগ করে কেন? বিভিন্ন গবেষণায় দেখা গেছে কর্মীদের প্রতিষ্ঠান ত্যাগের কারণ হিসেবে অনেকে বেতনকে মুখ্য উপকরণ হিসেবে বিবেচনা করলেও তা আসলে প্রায় ক্ষেত্রেই সঠিক না। কর্মীরা টাকার জন্য চাকরি করে এ কথা যেমন সত্য। আবার এর পাশাপাশি অন্যান্য অনার্থিক বিষয়গুলোও অনেকের কাছে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বিষয় এ কথাও ঠিক। অনেকের কাছে প্রতিষ্ঠানের কালচার পছন্দ হয় না বলে চাকরি ত্যাগ করে চলে যায়। কারও কাছে মনে হতে পারে তাঁর লাইন সুপারভাইজার একজন অপেশাদার কর্মী। কেউ ভাবতে পারে প্রতিষ্ঠানে করপোরেট কালচারের বড় অভাব। কারও মনে হতে পারে প্রতিষ্ঠানে যোগ্যতা অপেক্ষা অন্যকিছুকে বেশি প্রাধান্য দেওয়া হয়। প্রতিষ্ঠানে স্বচ্ছতার অভাব থাকলেও কেউ কেউ চাকরি ছাড়তে পারে। কেউ যদি মনে করে তাঁর মেধার মূল্যায়ন হচ্ছে না বা তিনি তাঁর মেধাকে সঠিকভাবে কাজে লাগাতে পারছে না তাহলেও একজন কর্মী চাকরি ছেড়ে অন্য কোনো প্রতিষ্ঠানে চলে যেতে পারে। প্রতিষ্ঠানের যদি ব্র্যান্ড ইমেজ না থাকে বা ভালো না থাকে তাহলেও অনেক কর্মী ওই প্রতিষ্ঠানে চাকরি করতে স্বাচ্ছন্দবোধ করে না। এছাড়া আরও কিছু কারণে একজন কর্মী প্রতিষ্ঠান ছাড়ার সিদ্ধান্ত গ্রহণ করতে পারে। যেমন, প্রতিষ্ঠানের যদি ভালো কোনো লক্ষ্য না থাকে। প্রতিষ্ঠান যদি নানা অনৈতিক কাজের সাথে জড়িত থাকে। প্রতিষ্ঠানে কর্মীদের যদি কোনো ভবিষ্যৎ না থাকে। প্রতিষ্ঠানে যদি ফ্যামিলি ইস্যুগুলোকে বিবেচনা না করা হয় ইত্যাদি।
প্রতিষ্ঠানকে সামনের দিকে এগিয়ে নিতে হলে কর্মীর কর্মস্থল ত্যাগের মাত্রা অবশ্যই কাম্যস্তরে রাখা প্রয়োজন, হ্রাস করা প্রয়োজন। কাম্যস্তর বা হ্রাস করা কিভাবে সম্ভব? বিষয়টি খুব কঠিন কিছু না। কর্মীর চাকরি ছাড়ার যে কারণগুলো ইতোমধ্যে আলোচিত হয়েছে সেগুলো যদি ঠিক করা যায় তাহলে কর্মীর চাকরি ছাড়ার হার কমে আসবে। প্রতিষ্ঠানকে যদি কর্মীবান্ধব করা যায় তাহলে কর্মীরা প্রতিষ্ঠানকে ভালোবাসবে, কাজকে ভালোবাসবে। তবে এখানে একটি বিষয় মনে রাখা প্রয়োজন, অনেক কর্মী প্রতিষ্ঠান ছেড়ে যায় না, বস বা লাইন সুপারভাইজারকে ছেড়ে যায়। এ কারণে প্রতিষ্ঠানকে অবশ্যই খেয়াল রাখতে হবে কর্মীরা তাঁদের বসের বিষয়ে কেমন ধারণা পোষণ করে। অনেক সময় দেখা যায় বস বা লাইন সুপারভাইজারের প্রতি এতোটাই অসন্তুষ্ট থাকে, বাধ্য হয়ে প্রতিষ্ঠান ছেড়ে দেয়। লাইন সুপারভাইজারদের মনে রাখা প্রয়োজন তাঁর দায়িত্ব শুধু কাজ আদায় করা নয়। শুধু হুকুম জারি করা নয়। প্রত্যেক কর্মীর ভালোমন্দ প্রতিটি বিষয়ের প্রতি তাঁর নজর থাকা প্রয়োজন। কোনো কর্মী কোনো কাজে দক্ষ না হলে তাঁকে প্রশিক্ষণ দিয়ে এবং অন্যান্য প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নিয়ে তাঁর দক্ষতা বাড়ানো লাইন সুপারভাইজারের দায়িত্ব। প্রতিষ্ঠানে নারীকর্মী থাকলে তাঁরা যেন পূর্ণ আস্থা নিয়ে কাজ করতে পারে, নিরাপদ অনুভব করতে পারে এ বিষয়গুলো প্রতিষ্ঠানের নিশ্চিত করা প্রয়োজন। কর্মীরা যেন তাঁদের যে কোনো অর্জনের স্বীকৃতি পায় সেটাও নিশ্চিত করা প্রয়োজন। তাহলেই কর্মীদের প্রতিষ্ঠান ত্যাগের মাত্রা কমে আসবে।
লেখার বিষয়বস্তু একান্তই লেখকের নিজস্ব মতামত।
এইচআর অ্যাডভাইজার, আইসিডিডিআরবি প্রতিষ্ঠাতা প্রেসিডেন্ট, ফেডারেশন অব বাংলাদেশ হিউম্যান রিসোর্স অর্গানাইজেশনস প্রতিষ্ঠাতা সাধারণ সম্পাদক ও সাবেক প্রেসিডেন্ট, বাংলাদেশ সোসাইটি ফর হিউম্যান রিসোর্সেস ম্যানেজমেন্ট সাবেক প্রেসিডেন্ট, এশিয়া প্যাসিফিক ফেডারেশন অব হিউম্যান রিসোর্সেস ম্যানেজমেন্ট এইচআর অ্যাডভাইজার, আইসিডিডিআরবি প্রতিষ্ঠাতা প্রেসিডেন্ট, ফেডারেশন অব বাংলাদেশ হিউম্যান রিসোর্স অর্গানাইজেশনস প্রতিষ্ঠাতা সাধারণ সম্পাদক ও সাবেক প্রেসিডেন্ট, বাংলাদেশ সোসাইটি ফর হিউম্যান রিসোর্সেস ম্যানেজমেন্ট সাবেক প্রেসিডেন্ট, এশিয়া প্যাসিফিক ফেডারেশন অব হিউম্যান রিসোর্সেস ম্যানেজমেন্ট