Global Header Bottom
অধীনস্থদের প্রতি একজন লাইন ম্যানেজার এবং এরিয়া সেলস ম্যানেজার এর আচরণ যেমন হওয়া প্রয়োজন

অধীনস্থদের প্রতি একজন লাইন ম্যানেজার এবং এরিয়া সেলস ম্যানেজার এর আচরণ যেমন হওয়া প্রয়োজন

অধীনস্থদের প্রতি  একজন লাইন ম্যানেজার  এবং এরিয়া সেলস ম্যানেজার এর  আচরণ যেমন হওয়া প্রয়োজন

যেকোনো প্রতিষ্ঠানের সাফল্যের পেছনে দক্ষ জনবল যেমন গুরুত্বপূর্ণ, তেমনি গুরুত্বপূর্ণ সেই জনবলকে সঠিকভাবে পরিচালনা করার মতো দক্ষ নেতৃত্ব। বিশেষ করে বিক্রয় ও বিপণননির্ভর প্রতিষ্ঠানে একজন লাইন ম্যানেজার অথবা এরিয়া সেলস ম্যানেজার অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন। তিনি শুধু কোম্পানির নির্ধারিত সেলস টার্গেট অর্জনের জন্য দায়ী নন; বরং তাঁর অধীনস্থ কর্মীদের পরিচালনা, প্রশিক্ষণ, অনুপ্রেরণা প্রদান, সমস্যা সমাধান এবং তাঁদের পেশাগত দক্ষতা বৃদ্ধির দায়িত্বও তাঁর ওপর বর্তায়। একজন ম্যানেজারের অধীনে বিভিন্ন ধরনের মানুষ কাজ করেন। প্রত্যেকের মেধা, অভিজ্ঞতা, কাজের ধরন, মানসিকতা, পারিবারিক অবস্থা, আত্মবিশ্বাস এবং সমস্যা মোকাবিলার সক্ষমতা এক রকম নয়।

তাই সবাইকে একইভাবে চাপ প্রয়োগ করে পরিচালনা করার পরিবর্তে প্রত্যেককে বোঝা এবং পরিস্থিতি অনুযায়ী নেতৃত্ব দেওয়া একজন দক্ষ ম্যানেজারের অন্যতম গুণ। একজন ম্যানেজার তাঁর অধীনস্থদের সঙ্গে কীভাবে কথা বলেন, ভুলের সময় কীভাবে প্রতিক্রিয়া জানান, ভালো কাজের মূল্যায়ন কীভাবে করেন এবং কঠিন সময়ে কর্মীর পাশে কতটা দাঁড়ান এসব বিষয় টিমের সামগ্রিক কর্মদক্ষতার ওপর গভীর প্রভাব ফেলে। সুতরাং একজন লাইন ম্যানেজার বা এরিয়া সেলস ম্যানেজারের মূল লক্ষ্য হওয়া উচিত শুধু অধীনস্থদের কাছ থেকে কাজ আদায় করা নয়; বরং তাঁদের এমনভাবে গড়ে তোলা, যাতে তাঁরা দায়িত্বশীল, দক্ষ, আত্মবিশ্বাসী এবং প্রতিষ্ঠানের প্রতি প্রতিশ্রুতিশীল হয়ে ওঠে। নিজ নিজ অবস্থানে থেকে একজন লাইন ম্যানেজার এবং একজন এরিয়া সেলস ম্যানেজারকে দায়িত্ব পালনের সময় যে বিষয়গুলো বিবেচনায় রাখা প্রয়োজন সেগুলো হলো:

অধীনস্থদের সম্মান করতে হবে

একজন ভালো ম্যানেজারের প্রথম এবং প্রধান গুণ হলো অধীনস্থ প্রত্যেক কর্মীকে মানুষ হিসেবে সম্মান করা। প্রতিষ্ঠানে পদমর্যাদার পার্থক্য থাকতে পারে, কিন্তু মানবিক মর্যাদার ক্ষেত্রে সবাই সম্মানের যোগ্য। কোনো কর্মী ভুল করলে তাঁকে অপমান করা, অশালীন ভাষায় কথা বলা, তুচ্ছতাচ্ছিল্য করা কিংবা সহকর্মীদের সামনে ছোট করা কখনোই ভালো নেতৃত্বের পরিচয় নয়। এতে সাময়িকভাবে কর্মী ভয় পেয়ে কাজ করতে পারে, কিন্তু দীর্ঘমেয়াদে তাঁর আত্মবিশ্বাস, সৃজনশীলতা এবং প্রতিষ্ঠানের প্রতি আন্তরিকতা কমে যেতে পারে। বিশেষ করে সেলস টিমে প্রতিদিনই বিভিন্ন ধরনের চাপ থাকে। টার্গেট, সেলস, প্রেসক্রিপশন, কাভারেজ, কালেকশন, রিপোর্টিং, ডিসট্রিবিউটর ম্যানেজমেন্ট, মার্কেট ভিজিট সবকিছু সামলাতে গিয়ে কর্মীদের ভুল হতে পারে। ভুল হলে সংশোধন করতে হবে, কিন্তু ব্যক্তির সম্মান নষ্ট করা উচিত নয়। একজন ভালো ম্যানেজারের নীতি হতে পারে “মানুষকে সম্মান করব, কিন্তু কাজের মানের ক্ষেত্রে আপস করব না।”

ভয় নয়, বিশ্বাসের পরিবেশ তৈরি করতে হবে

অনেক ম্যানেজার মনে করেন, অধীনস্থরা তাঁকে ভয় করলে কাজ ভালো হবে। বাস্তবে অতিরিক্ত ভয় একটি টিমের জন্য ক্ষতিকর হতে পারে। কারণ কর্মী যদি মনে করেন সত্য কথা বললে তাঁকে অপমান করা হবে, তাহলে তিনি সমস্যার কথা গোপন করতে শুরু করতে পারেন। উদাহরণস্বরূপ, কোনো এলাকায় বিক্রয় কমে গেলে একজন কর্মী যদি প্রকৃত সমস্যাটি ম্যানেজারকে বলতে ভয় পান, তাহলে তিনি হয়তো ভুল তথ্য দেবেন বা সমস্যা লুকানোর চেষ্টা করবেন। এতে সমস্যার সমাধান না হয়ে বরং পরিস্থিতি আরও খারাপ হতে পারে। ম্যানেজারের সঙ্গে এমন সম্পর্ক থাকা উচিত, যাতে কর্মী বলতে পারেন “স্যার, এখানে আমার সমস্যা হচ্ছে। আপনার সহযোগিতা প্রয়োজন।” এই ধরনের সম্পর্ক তৈরি হলে ম্যানেজারও প্রকৃত পরিস্থিতি জানতে পারেন এবং সময়মতো ব্যবস্থা নিতে পারেন। তাই ম্যানেজারকে এমন পরিবেশ তৈরি করতে হবে যেখানে থাকবে শৃঙ্খলা ও জবাবদিহিতা, কিন্তু অপ্রয়োজনীয় ভয় থাকবে না।

শুধু চাপ নয়, সঠিক দিকনির্দেশনা দিতে হবে

সেলস পেশায় টার্গেট গুরুত্বপূর্ণ। তাই ম্যানেজারকে টার্গেট নিয়ে কথা বলতেই হবে। কিন্তু শুধু বারবার “টার্গেট করতে হবে”, “সেলস বাড়াতে হবে” বা “এটা কেন হলো না?” বললে একজন ম্যানেজারের দায়িত্ব সম্পূর্ণ হয় না। যদি একজন কর্মীর টার্গেট অর্জিত না হয়, তাহলে প্রথমে কারণ বিশ্লেষণ করতে হবে। যেমন ডক্টর কাভারেজ ঠিক আছে কি না, আউটলেট কাভারেজ কম হচ্ছে কি না, প্রেসক্রিপশন জেনারেশন দুর্বল কি না, প্রেসক্রিপশন কনভারশন হচ্ছে কি না, স্টক অ্যাভেলাবিলিটি ঠিক আছে কি না, ডিস্ট্রিবিউটর-এর কোনো সমস্যা আছে কি না, কালেকশন আটকে আছে কি না অথবা প্রতিযোগী প্রতিষ্ঠান কোনো বিশেষ কার্যক্রম চালাচ্ছে কি না। কারণ শনাক্ত করার পর ম্যানেজারকে বাস্তবসম্মত অ্যাকশন প্ল্যান তৈরি করতে হবে। একজন প্রকৃত ম্যানেজার শুধু সমস্যা শনাক্ত করেন না; তিনি সমাধানের পথও দেখান।

ভালো কাজের প্রশংসা করতে হবে

মানুষ তাঁর ভালো কাজের স্বীকৃতি পেতে চায়। একটি ছোট প্রশংসাও একজন কর্মীর মধ্যে নতুন উদ্যম সৃষ্টি করতে পারে। কেউ টার্গেট অর্জন করলে, নতুন কোনো গুরুত্বপূর্ণ কাস্টমার তৈরি করলে, ভালো মার্কেট ডেভেলপমেন্ট করলে কিংবা কঠিন পরিস্থিতিতে ভালো ফলাফল আনলে তাঁর কাজের প্রশংসা করা উচিত। সম্ভব হলে ভালো কাজের প্রশংসা টিমের সামনে করা যেতে পারে। এতে সংশ্লিষ্ট কর্মী সম্মানিত বোধ করেন এবং অন্যরাও ভালো কাজ করতে অনুপ্রাণিত হন। ম্যানেজারের মনে রাখা উচিত, প্রশংসা করার জন্য অর্থ খরচ হয় না, কিন্তু আন্তরিক প্রশংসার মূল্য অনেক। তবে প্রশংসা যেন পক্ষপাতমূলক বা অতিরঞ্জিত না হয়। কাজের ভিত্তিতে যথাযথ স্বীকৃতি দিতে হবে।

ভুল হলে ব্যক্তিগতভাবে সংশোধন করা উচিত

একজন কর্মীর ভুল সংশোধন করা ম্যানেজারের দায়িত্ব। কিন্তু কীভাবে সংশোধন করা হচ্ছে, সেটিও গুরুত্বপূর্ণ। কর্মীর ছোটখাটো ভুল সবার সামনে তুলে ধরে অপমান করলে তিনি হয়তো আত্মসম্মানে আঘাত পেতে পারেন। ফলে ম্যানেজারের প্রতি তাঁর বিশ্বাস কমতে পারে। তাই সম্ভব হলে সংশোধনমূলক আলোচনা ব্যক্তিগতভাবে করা ভালো। ম্যানেজার বলতে পারেন “এই কাজটির এখানে কিছু সমস্যা হয়েছে। আমরা যদি পরবর্তীবার এভাবে করি, তাহলে ফলাফল আরও ভালো হতে পারে।” এ ধরনের ভাষায় কর্মী বুঝতে পারেন তাঁর ভুল হয়েছে, আবার একই সঙ্গে তিনি এটাও অনুভব করেন ম্যানেজার তাঁকে ছোট করার জন্য নয়, বরং উন্নত করার জন্য কথাগুলো বলছেন। নীতি হওয়া উচিত “প্রশংসা প্রকাশ্যে, সংশোধন ব্যক্তিগতভাবে।”

অধীনস্থদের কথা মনোযোগ দিয়ে শুনতে হবে

ম্যানেজার পদমর্যাদায় ওপরে থাকলেও সব বিষয়ে তাঁর তথ্যই যে সবচেয়ে বেশি থাকবে, এমন নয়। একজন মাঠপর্যায়ের কর্মী প্রতিদিন কাস্টমার, ডক্টর, রিটেলার, ডিস্ট্রিবিউটর এবং মার্কেটের সঙ্গে সরাসরি কাজ করেন। ফলে অনেক বাস্তব তথ্য তাঁর কাছে থাকে। তাই অধীনস্থদের মতামত গুরুত্ব দিয়ে শুনতে হবে। একজন কর্মী কোনো নতুন পরিকল্পনা দিলে তা সঙ্গে সঙ্গে বাতিল না করে আগে বুঝতে হবে। তাঁর পরিকল্পনা কার্যকর হলে তাঁকে সুযোগ দেওয়া উচিত। কর্মীদের কথা শোনার অভ্যাস একটি টিমে ওনারশিপ তৈরি করে। তাঁরা মনে করেন “এই প্রতিষ্ঠান এবং এই টিমে আমার মতামতেরও মূল্য আছে।”

পক্ষপাতহীন আচরণ করতে হবে

একজন ম্যানেজারের সবচেয়ে ক্ষতিকর আচরণগুলোর একটি হলো পক্ষপাতিত্ব। একজন কর্মী ব্যক্তিগতভাবে পছন্দের, দীর্ঘদিনের পরিচিত অথবা বেশি সেল করেন এসব কারণে তাঁর প্রতি আলাদা নিয়ম প্রয়োগ করা উচিত নয়। একই ধরনের ভুলের জন্য একজনকে কঠোর শাস্তি দেওয়া এবং অন্যজনকে ছেড়ে দেওয়া হলে টিমের মধ্যে অসন্তোষ সৃষ্টি হয়। কাজের মূল্যায়নের ক্ষেত্রে স্বচ্ছতা থাকা জরুরি। পারফরম্যান্স, ডিসিপ্লিন, রিপোর্টিং, মার্কেট ডেভেলপমেন্ট, টার্গেট অ্যাচিভমেন্ট, এবং প্রফেশনাল কনডাক্ট এসব বিষয়ের ভিত্তিতে কর্মীর মূল্যায়ন হওয়া উচিত। ন্যায্য ম্যানেজারের ওপর কর্মীরা আস্থা রাখেন। আর যে টিমে ন্যায্যতা থাকে, সেখানে পারস্পরিক সহযোগিতা এবং সম্মান বৃদ্ধি পায়।

প্রত্যেক কর্মীর সক্ষমতা বুঝতে হবে

একটি টিমের সব কর্মী একই রকম নয়। কেউ কমিউনিকেশনে ভালো, কেউ কাস্টমার রিলেশনশিপ-এ দক্ষ, কেউ প্ল্যানিং-এ ভালো, আবার কেউ নতুন মার্কেট ডেভেলপমেন্ট-এ দক্ষ। একজন দক্ষ ম্যানেজার প্রত্যেক কর্মীর শক্তি এবং দুর্বলতা শনাক্ত করেন। যে বিষয়ে কর্মী দুর্বল, সেখানে কোচিং ও ট্রেনিং দিতে হবে। আর যে বিষয়ে তিনি শক্তিশালী, সেই দক্ষতাকে আরও কাজে লাগানোর সুযোগ দিতে হবে। একজন ভালো ম্যানেজার কর্মীর দুর্বলতাকে শুধু সমালোচনা করেন না; বরং সেই দুর্বলতাকে শক্তিতে পরিণত করার চেষ্টা করেন।

প্রশিক্ষক ও কোচের ভূমিকা পালন করতে হবে

ম্যানেজার শুধু কাজের সুপারভাইজার নন; তিনি একজন কোচ-ও। নতুন একজন সেলস অফিসার বা রিপ্রেজেনটেটিভ হয়তো প্রোডাক্ট নলেজ ভালো জানেন, কিন্তু কাস্টমার হ্যান্ডলিং-এ দুর্বল। আবার কেউ ভালোভাবে কথা বলতে পারেন, কিন্তু টেরিটোরি প্ল্যানিং ঠিকভাবে করতে পারেন না। এসব ক্ষেত্রে ম্যানেজারকে হাতে-কলমে শেখাতে হবে। জয়েন্ট ফিল্ডওয়ার্ক, কাস্টমার কল ডেমোনস্ট্রেশন, ডেইলি প্ল্যানিং, রুট প্ল্যানিং, সেলস অ্যানালাইসিস এবং প্রবলেম সলভিং-এর মাধ্যমে কর্মীদের দক্ষতা বাড়ানো যায়। ম্যানেজারের সবচেয়ে বড় অর্জন তখনই, যখন তাঁর অধীনস্থ কর্মীরা সময়ের সঙ্গে তাঁর ওপর কম নির্ভরশীল হয়ে নিজেরাই সঠিক সিদ্ধান্ত নিতে সক্ষম হন।

ব্যক্তিগত আক্রমণ নয়, কাজের সমালোচনা করতে হবে

কোনো কর্মীর পারফরম্যান্স খারাপ হলে বলা যেতে পারে “এই মাসে আপনার পারফরম্যান্স আমাদের প্রত্যাশার নিচে রয়েছে।” কিন্তু বলা উচিত নয় “আপনাকে দিয়ে কিছু হবে না।” প্রথম বক্তব্যটি কাজের মূল্যায়ন; দ্বিতীয়টি ব্যক্তিগত আক্রমণ। একজন মানুষের একটি নির্দিষ্ট সময়ের পারফরম্যান্স খারাপ হতে পারে। তাই তাঁর বর্তমান ফলাফলকে তাঁর সম্পূর্ণ যোগ্যতার সঙ্গে মিলিয়ে দেখা ঠিক নয়। সমালোচনার উদ্দেশ্য হওয়া উচিত উন্নতি ঘটানো, আত্মবিশ্বাস ধ্বংস করা নয়।

শেয়ার করুন:

এই ক্যাটাগরির আরও নিবন্ধ

Global Before Footer