ব্রিজবেন, অস্ট্রেলিয়া থেকে
প্যাকেজিং নিয়ে কিছু কথা
একটি সফল মার্কেটিং মিক্স তৈরি করতে প্যাকেজিং-এর ভূমিকা অনস্বীকার্য। পণ্যের সফলতা অনেকাংশে নির্ভর করে প্যাকেজিং-এর ধরন এবং প্রকারের ওপর। প্যাকেজিং আসলে কি? সহজ ভাষায় বলা যেতে পারে- পণ্যের বন্টন, সংরক্ষণ, বিক্রয় এবং ব্যবহারের সময় তা সুরক্ষিত রাখার প্রক্রিয়াই হলো প্যাকেজিং। আর এর পেছনে কাজ করে প্রযুক্তি এবং শিল্পের সমন্বয়। প্যাকেজিং-এর কাজগুলোকে আমরা তিন ভাগে ভাগ করে দেখাতে পারি। যথা- প্রাইমারী, সেকেন্ডারী এবং টার্শিয়ারী।
প্রাইমারী কাজগুলো হলো পণ্যকে বাহ্যিক ক্ষতি থেকে সুরক্ষিত রাখা, সংরক্ষণে সহায়তা করা এবং পণ্য এক স্থান থেকে অন্য স্থানে বহন করার সময় তা নিরাপদ রাখা। সেকেন্ডারী কাজগুলো বাজারজাতকরণ সম্পর্কিত। এর মধ্যে রয়েছে পণ্যের বিক্রয় তরান্বিত করা, এর প্রচার ও প্রসারে সহায়তা করা এবং ক্রেতাকে পণ্য সম্পর্কিত বিভিন্ন তথ্য দিয়ে সিদ্ধান্ত গ্রহণে সহায়তা করা। এছাড়া টার্শিয়ারী কাজগুলোর মধ্যে রয়েছে প্যাকেজিং সংক্রান্ত বিবিধ কাজসমূহ। কোনো পণ্য ব্যবহার শেষে এর মোড়কটি পূনঃব্যবহারের মাধ্যমে ক্রেতা লাভবান হতে পারেন। যেমন, আমরা সফট ড্রিংকস পান করি। কখনো কখনো খালি বোতলটি ফেলে দিই, আবার কখনো তা সংরক্ষণ করি। তখন হয়তো বাসায় ফ্রিজে ঠান্ডা পানি রাখার কাজে ব্যবহার করি। আজকাল তো অনেকে কোকাকোলার বড় আকারের বোতলগুলো কেঁটে গাছ লাগানোর জন্য টব হিসেবেও ব্যবহার করছেন। তেলের পাঁচ লিটারের বোতলগুলো আমরা নানা কাজে ব্যবহার করতে দেখছি। আবার নগদ টাকায় বিক্রিও করা যায়।
প্রাথমিক অবস্থায় প্যাকেজিং-এর সূচনা হয়েছিল প্রকৃতিসিদ্ধ উপাদানসমূহ ব্যবহার করে। যেমন কাঠ, মাটি, সিরামিক ইত্যাদি। এসময় কাঠের বাক্স, মাটি ও সিরামিকের পাত্র পণ্যের মোড়ক হিসেবে ব্যবহৃত হত। সে অনেক আগের কথা। এরপর ধীরে ধীরে কাঁচ ও ব্রোঞ্জের পাত্রের ব্যবহার শুরু হয়। ১০৩৫ সালে এক পারস্যীয় পরিব্রাজক মিশরের রাজধানী কায়রোতে ভ্রমণ করতে আসেন। তাঁর লেখা ভ্রমণ বিবরণীতে কাগজের তৈরি মোড়ক ব্যবহারের কথা উল্লেখ রয়েছে। ঊনবিংশ শতাব্দীর প্রথম দিকে শক্ত কাগজের কার্টন ও ইস্পাতের তৈরি ক্যানের ব্যবহার শুরু হয়। ১৯৫২ সালে আমেরিকার মিশিগান স্টেট ইউনিভার্সিটি প্রথম প্যাকেজিং ইঞ্জিনিয়ারিং নিয়ে আসে, যা প্যাকেজিং শিল্পের উন্নয়নকে ব্যাপকভাবে তরান্বিত করে। এভাবে পর্যায়ক্রমে প্যাকেজিং শিল্পের সৃষ্টি ও সম্প্রসারণ হয়েছে।
এদেশে প্যাকেজিং-এ মূলত কাগজ ও প্লাস্টিকের ব্যবহারই সবচেয়ে বেশী দেখা যায়। কাগজের প্যাকেজ বা মোড়ক ডিজাইন করার সময় কিছু বিষয় বিবেচনা করা দরকার। যেমন, একটি সফল এবং কার্যকরী মোড়ক ডিজাইন করতে প্রয়োজন এ সম্পর্কিত জ্ঞান, চিন্তাশীলতা এবং শৈল্পিক মন। যেমনটি আগেও বলেছি প্যাকেজিং-এর মাধ্যমে ক্রেতা পণ্য ও তার ব্যবহার সম্পর্কে বিভিন্ন তথ্য জানতে পারেন। এছাড়া পণ্যের প্যাকেজিং এমন হওয়া প্রয়োজন, যেন তা সহজেই ক্রেতার দৃষ্টি আকর্ষণ করতে সক্ষম হয়। আকর্ষণীয় মোড়ক দেখামাত্রই ক্রেতা তা হাতে নিয়ে দেখতে আগ্রহ বোধ করেন। এক্ষেত্রে একটি বিষয় মনে রাখা প্রয়োজন, একজন ক্রেতা যখন কোনো দোকানে সাজানো পণ্যের দিকে দৃষ্টি দেন তখন খুব সামান্য সময়ের জন্যই তিনি তা দেখেন। চোখের পলকে তিনি সবগুলো পণ্য দেখে নেয়ার চেষ্টা করেন। কখনো কখনো তা মনে হতে পারে মাত্র কয়েক সেকেন্ডের ব্যাপার। সুতরাং যিনি প্যাকেজ বা মোড়কটি ডিজাইন করবেন, তাঁর কাছে শুধুমাত্র কয়েক সেকেন্ড সময় থাকে মোড়কের মাধ্যমে ক্রেতার মনোযোগ আকর্ষণ করার জন্য। একটি সফল প্যাকেজিং-এর জন্য কয়েকটি মৌলিক ধাপ অনুসরণ করা প্রয়োজন। যা এখানে সংক্ষিপ্ত পরিসরে উল্লেখ করা হলো।
ধারণা গ্রহণ
প্যাকেজের ডিজাইনটি কেমন হবে তা হঠাৎ করে ডিজাইনারের মাথায় না আসার সম্ভাবনাই বেশী। তাই ডিজাইনের কাজ শুরু করার আগে ডিজাইনারকে একই পণ্যের অন্যান্য প্যাকেজিং-এর আকার, আকৃতি, ধরন ইত্যাদি বিষয়গুলো পর্যবেক্ষণ করতে হবে। এভাবে ডিজাইনার পণ্যের আকার অনুযায়ী সম্পূর্ণ নতুন আরেকটি ডিজাইনের ধারণা পেতে পারেন।
সফ্টওয়্যার
সাধারণত প্রিন্টিং এর কাজে এডোবি ইলাস্ট্রেটর প্রোগ্রামটি বেশী ব্যবহার হয়। এছাড়া অন্যান্য সফ্টওয়্যারও ব্যবহার করা যাবে। কিন্তু মনে রাখতে হবে, প্রিন্টিং-এর ক্ষেত্রে ভেক্টর গ্রাফিক্স নিয়ে কাজ করতে হয়। তাই সফ্টওয়্যারটি এমন হওয়া দরকার যেন তা ভেক্টর সার্পোট করে।
টেমপ্লেট অনুসরণ
প্রতিটি কাগজের তৈরি বাক্স ডিজাইনের জন্য একটি টেমপ্লেট ব্যবহার করা হয়। এটি টেমপ্লেট অনুসারে এমনভাবে ডিজাইন করা প্রয়োজন যেন তা প্রিন্ট করার সময় একটি পেপার শীটে পুরো ডিজাইনটি প্রিন্ট করা সম্ভব হয়। এরপর এই পেপারটিকে বিভিন্ন স্থানে কেটে এবং ফোল্ড করে বাক্সে রূপান্তর করতে হয়।
কালার
রঙ নির্বাচনের আগে কালার মোড নির্বাচন বেশী জরুরি। প্রিন্টিং-এর কাজে সর্বাধিক ব্যবহৃত কালার মোডটি হল সিএমওয়াইকে (একে ফুল কালার প্রিন্টও বলা হয়)। অনেকে ভুল করে আরজিবি মোড ব্যবহার করেন যা এই ধরনের কাজের জন্য একেবারেই অনুপোযুক্ত।
এবার আসুন রঙ নির্বাচনের কথায়। এমন রঙ ব্যবহার করা ঠিক নয় যা প্যাকেজের লিখিত অংশের সাথে বেমানান। আবার এমন রঙও নির্বাচন করা ঠিক হবে না যা পণ্যের সাথে মানানসই নয়। রঙ নির্বাচনের জন্য কন্ট্রাস্ট মেনটেইন করতে হবে। অর্থাৎ দুটি রঙ-এর পার্থক্য যেন দৃষ্টিনন্দন হয় এভাবে রঙগুলোর বিন্যাস করতে হবে। আরেকটি কথা না বললেই নয়, ডিজাইনিং এর সময় কম্পিউটার মনিটরে যে রঙ দেখা যায়, তার সাথে প্রিন্ট করার পরের অবস্থার অমিল থাকা অস্বাভাবিক নয়। তাই মনিটরে যে রঙ ভালো তা মোড়কেও ভালো লাগবে এমনটি আশা করা মোটেই ঠিক নয়।
টেক্সট
ডিজাইন করা মোড়কটিতে যত লিখিত অংশ থাকে সেগুলোকে একত্রে টেক্সট বলে। ডিজাইনার যখন ডিজাইন করবেন তিনি তাঁর পছন্দ অনুসারে একটি ফন্ট ব্যবহার করেন। কিন্তু যেই কম্পিউটারে মোড়কের ডিজাইনটি প্রিন্ট করা হবে, তাতে যদি ফন্টটি ইন্সটল করা না থাকে তাহলে ফন্টে টেক্সটগুলো আসবে না। তাই ডিজাইন করার সময় সব টেক্সটগুলোকে আউটলাইন কিংবা প্যাথে কনভার্ট করে দিতে হবে।
ছবি এবং গ্রাফিক্স
মোড়কে যে সকল ছবি ও গ্রাফিক্স ব্যবহার করা হবে তা যেন কমপক্ষে ৩০০ ডিপিআই (ডট পার ইঞ্চি) হয়। এর নিচে যে কোনো ছবি বা গ্রাফিক্স প্রিন্ট করার পরে প্যাকেজের ইমেইজ কোয়ালিটি খারাপ হয়ে যায়। ইন্টারনেট থেকে ডাউনলোড করা ছবিগুলো সাধারণত ৭২ ডিপিআই হয়। তাই এ সকল ছবি সরাসরি প্যাকেজিং-এ ব্যবহার করা উচিৎ নয়।
সেইফটি এরিয়া
মনে রাখা প্রয়োজন, প্রিন্টিং-এর সময় কাগজটি ১ ইঞ্চির ৩২ ভাগের ১ ভাগ পরিমাণ জায়গা নড়ে যেতে পারে। তাই ‘সেইফটি এরিয়া’ হিসেবে মোড়কের ফোল্ডগুলো এবং গ্রাফিক্সের মধ্যে ১ ইঞ্চির ১৬ ভাগের ৩ ভাগ পরিমাণ জায়গা ছেড়ে দিতে হবে। তা না হলে ডিজাইনটি বাক্সের ফোল্ডে চলে আসতে পারে। অথবা কাটার সময় এর কিছু অংশ কাটা পরে যেতে পারে।
অন্যান্য
লেখার অংশটিতে কাজ করার সময় অশুদ্ধ বানান এবং বেখেয়ালী ভুল প্যাকেজিং-এর মান অনেকাংশে কমিয়ে দিতে পারে। তাই এ ব্যাপারে সতর্ক থাকা প্রয়োজন। এছাড়া ডিজাইনটি প্রস্তুতের পর ডিজাইনারকে জুম করে দেখতে হবে। খালি চোখে মোড়কের মাপগুলো সঠিক মনে হলেও, জুম করার পর অনেক ভুল বেড়িয়ে আসতে পারে। মোড়কের ডিজাইন করার সময় খুব বেশী টেক্সট সংযোজন করা একেবারেই উচিৎ নয়। গ্রাফিক্স, ছবি এবং টেক্সটের সমন্বয়ে ডিজাইনটি ক্রেতার কাছে আকর্ষণীয় করে তোলাই ডিজাইনারের কাজ। বাংলাদেশ সহ পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে অনেক সৃজনশীল মোড়কে পণ্য মার্কেটিং করা হচ্ছে। প্যাকেজিং সম্পর্কে সঠিক জ্ঞান ও ধারণা থাকলে পণ্য বাজারজাতকরণের কাজ অনেক সহজ হয়ে যায়।