Global Header Bottom
ব্র্যান্ডিং মানে শুধু লোগো, ফন্ট বা রঙ নয়

ব্র্যান্ডিং মানে শুধু লোগো, ফন্ট বা রঙ নয়

ব্র্যান্ডিং মানে শুধু   লোগো, ফন্ট বা রঙ নয়

সাম্প্রতিক সময়ে আমরা বেশ কিছু বড় ব্র্যান্ডের লোগোতে কিংবা নামে পরিবর্তন দেখেছি; তবে ব্র্যান্ডিং শব্দটি শুনলে অনেকের চোখের সামনে ভেসে ওঠে একটি সুন্দর লোগো, নির্দিষ্ট কিছু রঙ, আকর্ষণীয় স্লোগান কিংবা নান্দনিক বিজ্ঞাপন। কিন্তু আধুনিক ব্যবসায়িক বাস্তবতায় ব্র্যান্ডিং এর চেয়ে অনেক গভীর ও বিস্তৃত একটি ধারণা। একটি প্রতিষ্ঠানের লোগো বা ভিজ্যুয়াল পরিচয় গ্রাহককে প্রতিষ্ঠানটি চিনতে সাহায্য করে ঠিকই, কিন্তু গ্রাহকের মনে সেই প্রতিষ্ঠানের যে স্থায়ী পরিচয় তৈরি হয়, তা গড়ে ওঠে অভিজ্ঞতা, বিশ্বাস, অনুভূতি ও প্রত্যাশার সমন্বয়ে। গ্রাহকের চিন্তা, অনুভূতি ও অভিজ্ঞতার সঙ্গে পণ্য ও সেবার সংযোগ তৈরির শিল্পই হলো ব্র্যান্ডিং।

সহজভাবে বললে, ব্র্যান্ডিং হলো একটি প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে গ্রাহকের মনে তৈরি হওয়া সম্পর্কের নাম। আর এই সম্পর্ক যত শক্তিশালী হয়, ব্র্যান্ড তত বেশি মূল্যবান হয়ে ওঠে।

একটি প্রতিষ্ঠানের লোগো, রঙের প্যালেট, টাইপোগ্রাফি ও অন্যান্য ভিজ্যুয়াল উপাদান নিঃসন্দেহে গুরুত্বপূর্ণ। এগুলো একটি ব্র্যান্ডের পরিচিতি তৈরি করে এবং গ্রাহককে দ্রুত প্রতিষ্ঠানটিকে শনাক্ত করতে সাহায্য করে। কিন্তু এগুলো ব্র্যান্ডের কেবল দৃশ্যমান অংশ। একজন গ্রাহক যখন কোনো প্রতিষ্ঠানের কল সেন্টারে ফোন করেন, তখন কর্মীর আচরণও ব্র্যান্ডের অংশ। একটি ওয়েবসাইট কতটা সহজে ব্যবহার করা যায়, সেটিও ব্র্যান্ডের অভিজ্ঞতা। কোনো পণ্য কেনার পর সেটি ব্যবহার করতে গ্রাহক কতটা স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করছেন, কিংবা কোনো অভিযোগ করার পর প্রতিষ্ঠানটি কীভাবে

সমস্যার সমাধান করছে; প্রতিটি মুহূর্তই ব্র্যান্ড সম্পর্কে গ্রাহকের ধারণাকে প্রভাবিত করে। অর্থাৎ, একটি প্রতিষ্ঠানের প্রতিটি টাচপয়েন্ট আসলে ব্র্যান্ডের সঙ্গে গ্রাহকের একটি করে যোগাযোগের সুযোগ। এসব অভিজ্ঞতা ইতিবাচক হলে তৈরি হয় আস্থা; আর নেতিবাচক হলে ক্ষতিগ্রস্ত হয় ব্র্যান্ডের

সুনাম।

একটি ব্র্যান্ড কীভাবে তার গ্রাহকের সঙ্গে কথা বলে, সেটিও তার পরিচয়ের গুরুত্বপূর্ণ অংশ। যোগাযোগের ভাষা, শব্দচয়ন, বক্তব্যের ধরন কিংবা সংকটের সময় প্রতিষ্ঠানের প্রতিক্রিয়া; সবকিছু মিলেই তৈরি হয় ব্র্যান্ডের ভয়েস বা কণ্ঠস্বর। কোনো প্রতিষ্ঠান যদি সব সময় সহজ, মানবিক ও বন্ধুত্বপূর্ণ ভাষায় কথা বলে, গ্রাহকের কাছে তার একটি নির্দিষ্ট ব্যক্তিত্ব তৈরি হয়। আবার কোনো প্রতিষ্ঠান যদি সব যোগাযোগে আনুষ্ঠানিক ও পেশাদার ভাষা ব্যবহার করে, তার ক্ষেত্রেও ভিন্ন ধরনের ব্যক্তিত্ব গড়ে ওঠে।

তবে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো ধারাবাহিকতা। বিজ্ঞাপনে এক ধরনের প্রতিশ্রুতি দিয়ে বাস্তবে সম্পূর্ণ ভিন্ন অভিজ্ঞতা দিলে ব্র্যান্ডের প্রতি গ্রাহকের আস্থা নষ্ট হতে পারে। আজকের প্রতিযোগিতামূলক বাজারে অনেক পণ্য ও সেবার বৈশিষ্ট্য একে অপরের কাছাকাছি। ফলে শুধু পণ্যের বৈশিষ্ট্য দিয়ে দীর্ঘমেয়াদে পার্থক্য তৈরি করা কঠিন হয়ে পড়ছে। এখানেই গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে কাস্টমার এক্সপেরিয়েন্স বা গ্রাহক অভিজ্ঞতা। গ্রাহক একটি পণ্য কেনার আগে কী ধরনের তথ্য পাচ্ছেন, কেনার প্রক্রিয়া কতটা সহজ, বিক্রয়-পরবর্তী সেবা কেমন এবং কোনো সমস্যায় প্রতিষ্ঠান কত দ্রুত পাশে দাঁড়াচ্ছে; সবকিছু মিলেই তৈরি হয় সামগ্রিক অভিজ্ঞতা।

একজন গ্রাহক হয়তো কোনো পণ্যের বৈশিষ্ট্য কিছুদিন পর ভুলে যেতে পারেন। কিন্তু প্রতিষ্ঠানটি তাঁকে কীভাবে অনুভব করিয়েছে, সেই অভিজ্ঞতা দীর্ঘদিন মনে থাকতে পারে। তাই শক্তিশালী ব্র্যান্ড তৈরির ক্ষেত্রে পণ্যের মানের পাশাপাশি অভিজ্ঞতার মানও সমান গুরুত্বপূর্ণ।

মানুষ সব সিদ্ধান্ত কেবল যুক্তি দিয়ে নেয় না। বিশেষ করে কোনো ব্র্যান্ডকে বেছে নেওয়ার ক্ষেত্রে আস্থা, নিরাপত্তা, স্বস্তি, গর্ব কিংবা পরিচিতির অনুভূতি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। একই ধরনের দুটি পণ্যের মধ্যে একজন গ্রাহক অনেক সময় সেই ব্র্যান্ডটিকেই বেছে নেন, যার সঙ্গে তাঁর বেশি পরিচিতি বা ইতিবাচক অভিজ্ঞতা রয়েছে। এখানেই আবেগীয় ব্র্যান্ডিংয়ের গুরুত্ব। একটি সফল ব্র্যান্ড গ্রাহকের কাছে শুধু বলে না; “আমাদের পণ্য ভালো।” বরং তাঁর অভিজ্ঞতার মাধ্যমে বোঝায় “আপনি আমাদের ওপর নির্ভর করতে পারেন।” এই আস্থাই ধীরে ধীরে একবারের ক্রেতাকে দীর্ঘমেয়াদি ক্রেতায় পরিণত করে।

বাংলাদেশের দ্রুত পরিবর্তনশীল বাজারে ব্র্যান্ডিংয়ের গুরুত্ব দিন দিন বাড়ছে। ডিজিটাল মাধ্যমের বিস্তার, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের প্রভাব এবং গ্রাহকের সচেতনতা বৃদ্ধির কারণে এখন একটি প্রতিষ্ঠানের প্রতিটি কার্যক্রমই জনসাধারণের নজরে আসতে পারে। বিশেষ করে ব্যাংক, আর্থিক প্রতিষ্ঠান, বিমা, স্বাস্থ্যসেবা কিংবা অন্যান্য আস্থাভিত্তিক খাতে ব্র্যান্ডিংয়ের গুরুত্ব আরও বেশি। এসব ক্ষেত্রে গ্রাহক শুধু একটি পণ্য বা সেবা কেনেন না; তিনি নিজের অর্থ, সময় কিংবা ভবিষ্যৎ একটি প্রতিষ্ঠানের হাতে তুলে দেন। ফলে আস্থা ও বিশ্বাস এখানে ব্র্যান্ডের অন্যতম প্রধান সম্পদ। শুধু আকর্ষণীয় বিজ্ঞাপন কিংবা দৃষ্টিনন্দন লোগো দিয়ে সেই আস্থা তৈরি করা সম্ভব নয়। স্বচ্ছতা, গ্রাহকসেবার মান, প্রতিশ্রুতি রক্ষা, দ্রুত সমস্যা সমাধান এবং দায়িত্বশীল আচরণের ধারাবাহিকতাই একটি প্রতিষ্ঠানের প্রকৃত ব্র্যান্ড মূল্য তৈরি করে।

ব্র্যান্ডিং শুধু মার্কেটিং বিভাগের দায়িত্ব নয়; ব্র্যান্ডিং নিয়ে সবচেয়ে প্রচলিত ভুল ধারণাগুলোর একটি হলো এটি শুধু মার্কেটিং বা কমিউনিকেশন বিভাগের কাজ। বাস্তবে একটি ব্র্যান্ডের প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নের সঙ্গে প্রতিষ্ঠানের প্রায় প্রতিটি বিভাগ যুক্ত। মার্কেটিং গ্রাহকের কাছে যে প্রতিশ্রুতি দেয়, পণ্য বিভাগকে তা বাস্তবায়ন করতে হয়। বিক্রয় বিভাগ সেই প্রতিশ্রুতিকে গ্রাহকের কাছে পৌঁছে দেয়। গ্রাহকসেবা সেই অভিজ্ঞতাকে ধরে রাখে। প্রযুক্তি বিভাগ নিশ্চিত করে সেবার সহজলভ্যতা। এমনকি প্রতিষ্ঠানের অভ্যন্তরীণ সংস্কৃতিও শেষ পর্যন্ত গ্রাহকের অভিজ্ঞতায় প্রভাব ফেলে।

তাই শক্তিশালী ব্র্যান্ড তৈরির জন্য প্রয়োজন একটি সমন্বিত প্রতিষ্ঠানব্যাপী ব্র্যান্ড সংস্কৃতি। ব্র্যান্ডিং কোনো এককালীন নকশা, বিজ্ঞাপন বা প্রচারণার নাম নয়। এটি একটি ধারাবাহিক প্রক্রিয়া, যার মাধ্যমে একটি প্রতিষ্ঠান ধীরে ধীরে গ্রাহকের মনে নিজের অবস্থান তৈরি করে। লোগো মানুষকে ব্র্যান্ড চিনতে সাহায্য করে, কিন্তু অভিজ্ঞতা তাঁকে ব্র্যান্ডটি মনে রাখতে শেখায়। বিজ্ঞাপন মানুষকে আকৃষ্ট করতে পারে, কিন্তু আস্থা তাঁকে ধরে রাখে। আর ধারাবাহিক ভালো অভিজ্ঞতাই একজন গ্রাহককে শেষ পর্যন্ত ব্র্যান্ডের প্রতি অনুগত করে তোলে। সুতরাং, ব্র্যান্ডিংয়ের আসল ক্ষেত্র কোনো ডিজাইন স্টুডিও বা বিজ্ঞাপনের পর্দায় নয়; এটি গ্রাহকের মনে। যে প্রতিষ্ঠান গ্রাহকের চিন্তা, অনুভূতি ও প্রত্যাশাকে বুঝে প্রতিটি টাচপয়েন্টে একটি সামঞ্জস্যপূর্ণ ও ইতিবাচক অভিজ্ঞতা তৈরি করতে পারে, তারাই শেষ পর্যন্ত একটি নাম থেকে একটি শক্তিশালী ব্র্যান্ডে পরিণত হয়।

লীড- ব্র্যান্ড, কমিউনিকেশন অ্যান্ড মার্কেটিং , বাংলাদেশ ফাইন্যান্স পিএলসি

শেয়ার করুন:

এই ক্যাটাগরির আরও নিবন্ধ

Global Before Footer