Global Header Bottom
আমাদের দেশে গ্লোবাল ব্র্যান্ড তৈরি হয়নি কেন?

পর্ব- ৩

আমাদের দেশে গ্লোবাল ব্র্যান্ড তৈরি হয়নি কেন?

আমাদের দেশে গ্লোবাল ব্র্যান্ড তৈরি হয়নি কেন?

পার্শ্ববর্তী দেশ ভারতের সেভেন সিস্টার্স নামে পরিচিত অঞ্চলে পণ্য রপ্তানি করলেই সেটাকে গ্লোবাল ব্র্যান্ড বলা যায় না। সেভেন সিস্টার্স অঞ্চলে আমাদের দেশের কোনো কোনো ব্র্যান্ডের পণ্য বেশ ভালো বিক্রি হচ্ছে। এর মূল কারণ হলো ওই অঞ্চলে ভারতের পণ্য পৌঁছানো ব্যয়বহুল, কষ্টসাধ্য এবং সময়সাপেক্ষ। এছাড়া ভারতীয় পণ্য বিক্রি করলে ওই অঞ্চলের ব্যবসায়ীদের মুনাফা কম হয়। কারণ পণ্য পরিবহণে খরচ হয় অনেক বেশি। এ সকল কারণে সেভেন সিস্টার্সে বাংলাদেশি পণ্যের বিশেষ কদর রয়েছে। ওরা ব্র্যান্ড নিয়ে মাথা ঘামায় না। পণ্য কোন দেশের তৈরি সেটাও বিবেচ্য বিষয় নয়। ওদের মূল বিবেচ্য বিষয় হলো পণ্যের সহজলভ্যতা এবং দামে সুবিধা। মূলত এ দুটি কারণে ওই অঞ্চলে আমাদের দেশের বিভিন্ন ব্র্যান্ডের পণ্য বিক্রি হচ্ছে। ওই অঞ্চলের জনগণ যে টিভি চ্যানেলগুলো দেখছে সেখানে আমাদের দেশের পণ্যের বিজ্ঞাপনও প্রচার হচ্ছে। বিজ্ঞাপন দেওয়ার মূল কারণ হলো ওই অঞ্চলের ব্যবসায়ীরা বিজ্ঞাপন দিতে বলে। ফলে একদিকে যেমন পণ্যের প্রচার হচ্ছে, বিক্রি বাড়ছে, অন্যদিকে বিজ্ঞাপন দেওয়ার কারণে ভারতের টেলিভিশন চ্যানেলগুলোর আয় বাড়ছে। এ সকল কারণে আমাদের দেশের যে পণ্যগুলো ওই অঞ্চলে রপ্তানি হচ্ছে সেখানে আমাদের পণ্যের বিজ্ঞাপনও প্রচার হচ্ছে।

পাকিস্তানের শান ব্র্যান্ডের মসলা বেশ মানসম্পন্ন। ওরা পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে এই মসলা রপ্তানি করছে। ওরা এটা বিবেচনা করছে না কোন দেশে পাকিস্তানি আছে বা নেই। ওদের মূল লক্ষ্য পাকিস্তানের নাগরিক নয়। ওরা গ্লোবাল স্ট্যান্ডার্ড বিবেচনা করে পণ্য তৈরি করছে। অথচ আমরা সে কাজটি করতে পারছি না। রাঁধুনী ব্র্যান্ড নিয়ে বরাবরই আমি কথা বলি। আমি মনে করি একটি গ্লোবাল ব্র্যান্ড হওয়ার জন্য যে ধরনের যোগ্যতা থাকা প্রয়োজন তার সবই রাঁধুনীর মধ্যে আছে। কিন্তু তারপরেও রাঁধুনী সে পথে হাঁটছে না। কেন হাঁটছেনা সেটা আমার বোধগম্য নয়। আমি আবারও বলব রাঁধুনী ইচ্ছে করলে একটি গ্লোবাল ব্র্যান্ড হতে পারত।

একটি ব্র্যান্ডকে গ্লোবাল ব্র্যান্ড হতে হলে অথেন্টিকেশন এবং হেরিটেজ থাকতে হয়। একটা আইডেন্টিফিকেশন থাকতে হয়। এই জায়গাটিতে আমরা পিছিয়ে রয়েছি। ভারত সব সময় এটা মেনে চলার চেষ্টা করে। ওদের আরেকটি বিষয় বেশ লক্ষণীয়। ওদের দেশে প্রতিটি গ্লোবাল ব্র্যান্ডকে নিজস্ব পরিচয়ে পরিচিত করানোর চেষ্টা করে। যেমন টাটা এবং টাইটান। একই গ্রুপের দুটি ব্র্যান্ড হওয়ার পরেও অনেকে এটা জানেনা যে এই দুটি ব্র্যান্ড একই মালিকের বা গ্রুপের। টাইটান নিজের সত্ত্বা নিয়ে বাজারে টিকে রয়েছে। নিজের পরিচয়ে টিকে রয়েছে। টাটার পরিচয় নিয়ে বাজারে টিকে থাকেনি।

আমাদের দেশে আগামী দিনে হয়তো বিকাশ একটি গ্লোবাল ব্র্যান্ড হিসেবে আত্মপ্রকাশ করতে পারে। বিকাশের ধারাবাহিক কার্যক্রমগুলো যদি আমরা লক্ষ্য করি তাহলে দেখতে পাবো এর প্রতিটি কাজের পেছনের গল্পগুলো বেশ চমৎকার। আবার প্রতিটি কাজের মধ্যে একটি ধারাবাহিকতা রয়েছে। এই ধারাবাহিকতা বলে দিচ্ছে কখন কি করা প্রয়োজন ছিল আর কোম্পানির পক্ষ থেকে কি করা হয়েছে। যখন যে কাজটি যেভাবে করা প্রয়োজন মনে করেছে বিকাশ সেটাই করেছে। তারই ধারাবাহিকতায় আজকে বিকাশের ব্যবসা এতটাই প্রসারিত হয়েছে যে কয়েকটি ব্যাংক মিলেও লেনদেনে বিকাশের ধারে কাছে নেই। কাস্টমার সার্ভিস এর ক্ষেত্রেও বিকাশ নিরলসভাবে কাজ করে চলেছে। একসময় বিকাশের কার্যক্রমের কেন্দ্রবিন্দুতে মূল ছিল সেবার বিষয়টিকে গ্রাহকদের জানানো এবং সেবা দেওয়া। কিন্তু সময়ের পরিক্রমায় বিকাশ তাদের কর্মপরিধি অনেক বাড়িয়েছে।

বিকাশের উদ্যোক্তারা বুঝতে পেরেছিলেন বাংলাদেশে আর্থিক অন্তর্ভুক্তির প্রয়োজনীয়তা কতটুকু বৃদ্ধি পাবে এবং কিভাবে বৃদ্ধি পাবে। এ সবই বিকাশের উদ্যোক্তারা অ্যানালাইসিস করেছিলেন। যে কারণে আজকে তাদের ব্যবসায়ের সাফল্যের এই গল্পগুলো মানুষের মুখে মুখে। কিভাবে ফাইন্যান্সিয়ালি ইনক্লুশন করতে হবে এবং তা বাড়াতে হবে তার সবই বিকাশের কর্মপরিকল্পনায় ছিল। শুধু আর্থিক কার্যক্রমে জনগণকে সম্পৃক্ত করা নয়, বরং তাঁদের অর্থের আদান প্রদান যেন নির্বিঘেœ হয়, নিরাপদে হয় সেটা নিয়েও বিকাশ নিরলসভাবে কাজ করে চলেছে। এগুলো সবই বিকাশের ভিশনকেন্দ্রিক কার্যক্রমের প্রতিচ্ছবি।

প্রোডাক্ট, প্রমোশন, সার্ভিস, সিকিউরিটি, কোন জায়গায় বিকাশের উপস্থিতি নেই। প্রতিটি কাজ ঠিক যেভাবে করা প্রয়োজন সেভাবেই করে যাচ্ছে। আর এটাই বিকাশের এগিয়ে যাওয়ার পথে শক্তি হিসেবে কাজ করছে। কাস্টমার কেয়ার, কোলাবরেশন প্রতিটি ক্ষেত্রে বিকাশ তার স্বকীয়তা বা দৃষ্টান্ত নিজেই রচনা করছে। প্রতিনিয়ত সফটওয়্যার আপডেট নিয়ে ভাবছে। কাস্টমার সার্ভিস নিয়ে ভাবছে। মোটের ওপর একটি ব্র্যান্ডকে গ্লোবাল ব্র্যান্ডে পরিণত করার জন্য যা যা করণীয় বিকাশ তার সবই করছে। আমি ধারণা করছি বিকাশ এর পরে রেমিটেন্স এর ওপর গুরুত্ব দিয়ে প্রমোশনের কাজটি আরও বৃদ্ধি করবে। এরপর হয়তো বিকাশ নাম ধারণ না করে অথবা বিকাশ নামেই অন্য কোনো দেশে তাদের সেবার পরিধি সম্প্রসারণ করবে। বিকাশের বর্তমান যে চলমান গতি তা হয়তো আগামী দিনে আরও অনেক গতিশীল হবে।

একটি গ্লোবাল ব্র্যান্ড হতে হলে প্রমিজ বা প্রতিশ্রুতি থাকতে হয়। আমি ক্রেতাদের কি প্রতিশ্রুতি দিচ্ছি সেটা আমাকে বিবেচনায় রাখতে হবে। আমাকে অবশ্যই ওই প্রতিশ্রুতি দিতে হবে যেটা আমি ক্রেতাকে দিতে পারব। আর যে প্রতিশ্রুতি দেব বাস্তবিক অর্থে তার চেয়ে বেশি দেওয়ার চেষ্টা করতে হবে। এই কমিটমেন্ট এর জায়গায় আমরা মনে হয় অনেক পেছনে পড়ে রয়েছি। আমাদের কোনো কোনো ব্র্যান্ড হয়তো এ কারণেও গ্লোবাল ব্র্যান্ড হওয়ার পথে থমকে যাবে। আমাদের মনে রাখতে হবে গ্লোবাল ব্র্যান্ড হতে হলে সবকিছুকে “অ্যাট অ্যা গ্ল্যান্স” চিন্তা করতে হবে। এটা করতে না পারলে ব্র্যান্ড কখনো গ্লোবাল ব্র্যান্ড হয় না।

মার্কেটিং কনসালট্যান্ট

শেয়ার করুন:

এই ক্যাটাগরির আরও নিবন্ধ

Global Before Footer