Global Header Bottom
ইমোশনাল ব্র্যান্ডিং

পর্ব- ১৯

ইমোশনাল ব্র্যান্ডিং

ইমোশনাল ব্র্যান্ডিং

আইকনিক ব্র্যান্ড

দ্য আর্ট অ্যান্ড সাইন্স অব ব্র্যান্ডিং। এখানে আর্ট বলতে বোঝানো হয়েছে মানুষের সৃজনশীলতা ও শৈল্পিকতা ব্যবহার করে ব্র্যান্ড ডেভেলপমেন্টের বিভিন্ন কার্যক্রম পরিচালনা করা। সৃজনশীলতা এবং শৈল্পিক ডিজাইন প্রয়োগ করে একটি ব্র্যান্ডকে মানুষের পছন্দের তালিকায় নিয়ে যাওয়াই ব্র্যান্ড ডেভেলপমেন্টের উদ্দেশ্য হওয়া উচিত। ব্র্যান্ডিংয়ের ক্ষেত্রে সাইন্স হলো ব্র্যান্ডিংয়ের বিভিন্ন কৌশল ও পদ্ধতি যা প্রয়োগ করে একটি ব্র্যান্ডকে যৌক্তিকভাবে মানুষের কাছে উপস্থাপন করা হয় যেন মানুষের মনে আবেগ অনুভুতি সৃষ্টি করতে পারে। একটি সফল ব্র্যান্ড সবসময় মানুষের হৃদয়ে অবস্থান করে।

আইকনিক ব্র্যান্ড হচ্ছে এমন এক ধরনের ব্র্যান্ড যা সবার কাছে গ্রহণযোগ্য। যেকোনো আইকনিক ব্র্যান্ডের সাথে কালচারাল আইকনের সরাসরি সম্পর্ক রয়েছে। কালচারাল আইকনিক ব্র্যান্ড হচ্ছে স্টিভ জবস, মহাত্মা গান্ধি, রেম্বো, এলভিস প্রিসলি ইত্যাদি। পৃথিবীতে সবচেয়ে সেরা আইকনিক ব্র্যান্ড হচ্ছে আইফোন, আইবিএম, কোকাকোলা ইত্যাদি। আইকনিক ব্র্যান্ডের গুরুত্ব কাস্টমারদের কাছে সবচেয়ে বেশি। আইকনিক ব্র্যান্ড কাস্টমাররা সবচেয়ে বেশি পছন্দ করে এবং ভালোবাসে। কাস্টমাররা আইকনিক ব্র্যান্ডের প্রতি সবচেয়ে বেশি আস্থাশীল হয়ে থাকে। সেজন্য বলা হয় যেকোনো আইকনিক ব্র্যান্ড হচ্ছে কাস্টমারদের কাছে বিশ্বাস এবং আস্থার প্রতীক। এই মুহূর্তে গুগল, অ্যাপল এবং ফেসবুক হচ্ছে সারা পৃথিবীর বেশিরভাগ মানুষের কাছে সবচেয়ে বেশি আইকনিক ব্র্যান্ড। পৃথিবীর বেশিরভাগ মার্কেটারের ইচ্ছা থাকে আইকনিক ব্র্যান্ড ডেভেলপ করা। যদিও খুব স্বল্প সংখ্যক ব্র্যান্ড আইকনিক ব্র্যান্ডের মর্যাদা লাভ করতে পারে। কিন্তু কেন খুব স্বল্প সংখ্যক ব্র্যান্ড আইকনিক ব্র্যান্ডের মর্যাদা লাভ করে সে বিষয়টি বিশ্লেষণ করা দরকার।

ব্র্যান্ডিং বিজ্ঞানসম্মত একটি বিষয় যা বিভিন্ন ভাবে ডেভেলপ করতে হয়। কার্যকর ব্র্যান্ডিং করার জন্য যুগে যুগে বিভিন্ন মডেল বা পদ্ধতি অনুসরণ করা হয়েছে। আইকনিক ব্র্যান্ড ডেভেলপমেন্টের উল্লেখযোগ্য মডেলগুলো হলো মাইন্ড-শেয়ার ব্র্যান্ডিং মডেল (১৯৭০), ইমোশনাল ব্র্যান্ডিং মডেল (১৯৯০), ভাইরাল ব্র্যান্ডিং মডেল (২০০০), কালচারাল ব্র্যান্ডিং মডেল (২০১০)।

মাইন্ড-শেয়ার ব্র্যান্ডিং মডেল

ডাব সাবান হচ্ছে মাইন্ড-শেয়ার ব্র্যান্ডিংয়ের একটি উদাহরণ। সাধারণত ময়েশ্চারাইজিং ক্রীম থেকে ডাব সাবানের ধারণার সৃষ্টি। ডাব সাবান হচ্ছে কাস্টমারদের কাছে আভিজাত্য এবং আস্থার উদাহরণ। ডাব সাবানের আদ্রতা ত্বকের প্রতি খুবই সহনশীল। এটি ব্র্যান্ড লয়্যাল কাস্টমারের মনে আবেগ অনুভুতি সৃষ্টি করে। কাস্টমার একটি ব্র্যান্ডের ফিচার, বেনিফিট, গুণগতমান, স্বাদ, সুগন্ধ ইত্যাদি বিষয় নিয়ে চিন্তা করেন। পঞ্চাশের দশকে মাইন্ড-শেয়ার ব্র্যান্ডিংয়ের জন্য ব্র্যান্ডের ইউনিক সেলিং পয়েন্টকে গুরুত্ব দিয়ে ব্র্যান্ড প্রমোশন কার্যক্রম পরিচালনা করা হতো। কোকাকোলা, নেসলে, ইউনিলিভার এর মতো কোম্পানিগুলো ব্র্যান্ডিংয়ের জন্য মাইন্ড-শেয়ার মডেল অনুসরণ করে ব্র্যান্ডিং কার্যক্রম পরিচালনা করত। মাইন্ড-শেয়ার ব্র্যান্ডিং মডেল ব্র্যান্ডের সাথে ইমোশন তৈরির কাজ করে। এছাড়া ব্র্যান্ড পারসোনালিটি, ব্র্যান্ড কোয়ালিটি এবং ব্র্যান্ড বেনিফিট এখানে উল্লেখযোগ্য বিষয়।

ইমোশনাল ব্র্যান্ডিং মডেল

একটি ব্র্যান্ডের মধ্যে দুই ধরনের বেনিফিট থাকে। ফাংশনাল বেনিফিট এবং ইমোশনাল বেনিফিট। এই দুই বেনিফিটকে ব্র্যান্ডের ডিএনএ বলা হয়। নব্বইয়ের দশকে ব্র্যান্ড প্রমোশন করার জন্য ইমোশনাল বেনিফিটকে সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব দেওয়া হতো। একটি ব্র্যান্ডের ফাংশনাল বেনিফিট হচ্ছে ব্র্যান্ডের মধ্যে বিদ্যমান থাকা বিভিন্ন ধরনের ফিচার। একটি ব্র্যান্ডের ফিচার থেকে ব্র্যান্ড ফাংশন তৈরি হয়। যে কোনো কাস্টমারের কাছে ব্র্যান্ড ফিচার বা ব্র্যান্ড ফাংশন অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। ব্র্যান্ড ফিচার বা ব্র্যান্ড ফাংশন বোঝানোর জন্য বিভিন্ন ধরনের শব্দ ব্যবহার করা হয়। যেমন স্পিড বা গতি, এডভান্স টেকনোলজি বা সর্বাধুনিক প্রযুক্তি, সেইফটি বা নিরাপদ, ইত্যাদি তুলনামূলক পার্থক্য করার মতো শব্দ ব্যবহার করা হয়। অন্যদিকে, একটি ব্র্যান্ড ব্যবহার করার পর কাস্টমারের মনে যে ধরনের অনুভূতি এবং সন্তুষ্টি তৈরি হয় সেটাই হচ্ছে ইমোশনাল বেনিফিট। কাস্টমাররা সবসময় ব্র্যান্ডের ইমোশনাল বেনিফিট অনুভব করতে পারে। ইমোশনাল বেনিফিটের কারণে কাস্টমারের মনে ব্র্যান্ড সেটিসফেকশন তৈরি হয়। ইমোশনাল ব্র্যান্ডিং করার জন্য কিছু বিষয়কে সবসময় গুরুত্ব দিতে হয়।

যেমন, ব্র্যান্ডিং করার সময় কাস্টমারকে একজন মানুষ হিসেবে চিন্তা করতে হবে। ব্র্যান্ড ব্যবহার করার পর একজন কাস্টমারের মনে ব্র্যান্ড সম্পর্কে যে অভিজ্ঞতা তৈরি হবে তা কাস্টমার ১০ জন সাধারণ মানুষের সাথে শেয়ার করে। অর্থাৎ একজন কাস্টমার ১০ জন ভবিষ্যত কাস্টমার তৈরি করতে পারে। একটি ব্র্যান্ড ব্যবহার করার পর যাতে কাস্টমারের মনে ব্র্যান্ড সম্পর্কে নতুন অভিজ্ঞতা তৈরি হয় সে বিষয়টিকে প্রাধান্য দিয়ে ব্র্যান্ডিং করতে হবে। ব্র্যান্ড প্রমিজ বা প্রতিশ্রুতিকে বিশ^াসে পরিণত করতে হবে। যেকোনো ব্র্যান্ড কাস্টমারের জন্য বিভিন্ন ধরনের প্রতিশ্রুতি করে থাকে। ব্র্যান্ড প্রতিশ্রুতি রক্ষা করা ব্র্যান্ডিং কার্যক্রমের অন্যতম প্রধান দায়িত্ব ও কর্তব্য। ব্র্যান্ড প্রমিজ বা প্রতিশ্রুতি রক্ষা করার মাধ্যমেই ব্র্যান্ডের সততা তৈরি হয়।

যে ব্র্যান্ড ধারাবাহিকভাবে ব্র্যান্ড প্রমিজ বা প্রতিশ্রুতি এবং ব্র্যান্ডের সততা ধরে রাখতে পারবে ওই ব্র্যান্ড কাস্টমারের কাছে সবচেয়ে বিশ^স্ত ব্র্যান্ড হিসেবে মর্যাদা লাভ করতে পারবে। ব্র্যান্ড ডেভেলপমেন্টের ক্ষেত্রে কোয়ালিটির গুরুত্ব অপরিসীম। একটি নির্ভরযোগ্য ব্র্যান্ডের শতভাগ কোয়ালিটি থাকতে হবে। কোয়ালিটি ছাড়া একটি ব্র্যান্ডকে কোনোভাবেই কল্পনা করা যায় না। একজন কাস্টমার সর্বপ্রথম একটি ব্র্যান্ডের কোয়ালিটির প্রতি আস্থাশীল হতে চায়। একটি ব্র্যান্ড কোয়ালিটির কারণে কাস্টমারের আস্থা ও ভালোবাসা অর্জন করার পর অগ্রাধিকার ভিত্তিতে কাস্টমারের পছন্দের তালিকায় স্থান পায়। মানুষ সবসময় আস্থাশীল ব্র্যান্ডকেই অগ্রাধিকার ভিত্তিতে ক্রয় করতে চায়।

একটি ব্র্যান্ড সম্পর্কে মানুষের খারাপ ধারণা থাকলেও ব্র্যান্ডিং কার্যক্রম এমন হওয়া উচিত যাতে মানুষ ব্র্যান্ডের কুখ্যাতির কথা ভুলে গিয়ে একই ব্র্যান্ড সম্পর্কে ভালো ধারণা ধারণ করে। পৃথিবীর অনেক কুখ্যাত ব্র্যান্ড সেরা ব্র্যান্ডিং কার্যক্রমের কারণে মানুষের মনে সেরা ব্র্যান্ড হিসেবে স্থান দখল করে নিয়েছে। যেকোনো ব্র্যান্ডের ব্র্যান্ডিং কার্যক্রম এমন হওয়া উচিত যাতে মানুষ ব্র্যান্ড দেখে ক্রয় করার জন্য অনুপ্রাণিত হয়। যেকোন ব্র্যান্ডের জন্য সার্ভিস একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। ভালো সার্ভিসের কারণে একটি ব্র্যান্ডের সাথে কাস্টমারের সুসম্পর্ক গড়ে উঠে। ইমোশনাল ব্র্যান্ডিং মডেলের গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হচ্ছে, ব্র্যান্ডিংয়ের মাধ্যমে ব্র্যান্ডের সাথে কাস্টমারের দীর্ঘস্থায়ী সুসম্পর্ক তৈরি করা।

ভাইরাল ব্র্যান্ডিং মডেল

ভাইরাল ব্র্যান্ডিং হচ্ছে অনেকটা ওয়ার্ড অব মার্কেটিং এর মতো। ভাইরাল ব্র্যান্ডিং, গেরিলা মার্কেটিং কিংবা বাজ মার্কেটিং এর ন্যায় কাজ করে। ডিজিটাল মার্কেটিং এর কারণে ভাইরাল ব্র্যান্ডিং এখন অনেক বেশি জনপ্রিয় এবং বিক্রয় বৃদ্ধির জন্য কার্যকরী। পৃথিবীর বেশিরভাগ সফল ব্র্যান্ড এখন ভাইরাল ব্র্যান্ডিংয়ের মাধ্যমে বিজনেস এর প্রসার এবং প্রবৃদ্ধি নিশ্চিত করছে। স্যোশাল মিডিয়ার এ যুগে এখন ৯০% ব্র্যান্ড ভাইরাল ব্র্যান্ডিং কার্যক্রমের দিকে ঝুঁকছে। গতানুগতিক ব্র্যান্ডিংয়ের চেয়ে মানুষ এখন ভাইরাল ব্র্যান্ডিংয়ের দিকে বেশি ঝুঁকছে। সত্যিকার অর্থে একটি ভাইরাল ব্র্যান্ডিং তখনই সফল হবে যখন ভাইরাল ব্র্যান্ডিং শতভাগ সৎ হবে, স্বচ্ছ থাকবে এবং প্রভাব বিস্তার করতে সাহায্য করবে।

(চলবে)

জিএম, সেলস অ্যান্ড মার্কেটিং এশিয়াটিক ল্যাবরেটরীজ লিমিটেড

শেয়ার করুন:

এই ক্যাটাগরির আরও নিবন্ধ

Global Before Footer