Global Header Bottom
ভোক্তা আচরণ সম্পর্কে কেন জানতে হবে?

পর্ব- ৩

ভোক্তা আচরণ সম্পর্কে কেন জানতে হবে?

ভোক্তা আচরণ সম্পর্কে কেন জানতে হবে?

গত সংখ্যায় উল্লেখ করেছিলাম ভোক্তারা খুব দ্রুত পণ্যের ব্র্যান্ড পরিবর্তন করে। যাঁরা চেইন স্মোকার তাঁরা সাধারণত ব্র্যান্ডের প্রতি লয়্যাল থাকেন। তথাপি তাঁদের বেলায়ও ব্র্যান্ড পরিবর্তন হয়। হয়তো সেটা খুব ধীরে হয়। কিন্তু পরিবর্তন দৃশ্যমান। ক্রেতারা বিভিন্ন কারণে সিগারেটের ব্র্যান্ড পরিবর্তন করতে পারেন। কেউ হয়তো আর্থিক অবস্থার কারণে পরিবর্তন করছেন। কেউ স্বাস্থ্য বা টেস্ট অথবা অন্য কোনো কারণে পরিবর্তন করছেন। বাস্তবতা হলো পরিবর্তন হচ্ছে। এই পরিবর্তনের ধরন মার্কেটারকে বুঝতে হবে। আমি গত সংখ্যায় ক্যালকুলেটরের উদাহরণ দিয়েছিলাম। বলেছিলাম সাধারণ ক্যালকুলেটর থেকে মানুষ সাইন্টিফিক ক্যালকুলেটরের যুগে অবস্থান করছেন। সাধারণ ক্যালকুলেটর এবং সাইন্টিফিক ক্যালকুলেটরের মধ্যে ব্যাপক পার্থক্য রয়েছে। সাইন্টিফিক ক্যালকুলেটরে নানা ধরনের সুবিধা বিদ্যমান। তাহলে সাধারণ ক্যালকুলেটরের চাহিদা বা উপযোগিতা কী শেষ হয়ে গেছে? সাধারণ ক্যালকুলেটরের বাজার কী হারিয়ে গেছে? না, তেমনটি হয়নি। কারণ, আমাদের দেশে এখনো সাধারণ ক্যালকুলেটরের অনেক বড় একটি বাজার রয়েছে।

সাইন্টিফিক ক্যালকুলেটরের প্রতি তাঁদেরই আগ্রহ রয়েছে যাঁদের পড়ালেখা বা কর্মক্ষেত্রের সাথে এই ক্যালকুলেটরের ব্যবহার জড়িত। উচ্চশিক্ষা বিশেষ করে যেখানে গণিত ও পরিসংখ্যানের ব্যবহার রয়েছে সেখানে সাইন্টিফিক ক্যালকুলেটরের ব্যবহার বা উপযোগিতা এড়িয়ে যাওয়ার সুযোগ নেই। এছাড়া জটিল কিছু হিসাবনিকাশের ক্ষেত্রে সাইন্টিফিক ক্যালকুলেটর ব্যবহার করতে হয়। এর বাইরে এই ক্যালকুলেটরের ব্যবহার তেমন একটা নেই বললেই চলে। অন্যদিকে সাধারণ ক্যালকুলেটর বিভিন্ন কাজে এখনো ব্যাপকভাবে ব্যবহার হচ্ছে। ক্ষুদ্র ব্যবসা থেকে শুরু করে বড় ব্যবসা প্রতিষ্ঠান সকল ক্ষেত্রেই এর ব্যবহার লক্ষ্যণীয়। এছাড়া একজন বয়স্ক ব্যক্তি যিনি সাইন্টিফিক ক্যালকুলেটর ব্যবহার করতে স্বাচ্ছন্দবোধ করেন না, তিনি অবলীলায় একটি সাধারণ ক্যালকুলেটর ব্যবহার করতে পারেন। বাসা-বাড়িতে হিসাবনিকাশ করার জন্য অনেকে ক্যালকুলেটর ব্যবহার করেন। এদের জন্যও সাধারণ ক্যালকুলেটর আদর্শ। মার্কেটাররা এটা বুঝতে পারেন বলেই এখনো সাইন্টিফিক ক্যালকুলেটরের পাশাপাশি সাধারণ ক্যালকুলেটর মার্কেটিং করছেন। বাজারের এই চাহিদা একজন মার্কেটারকে বুঝতে হবে। একটি নতুন পণ্য বাজারে আসা মানেই পুরোনো পণ্যের উপযোগিতা শেষ হয়ে যাওয়া নয়। কোনো কোনো পণ্যের ক্ষেত্রে এটা সত্য বলে প্রমাণিত হলেও সকল পণ্যের ক্ষেত্রে সত্য নয়। এই সত্যটা মার্কেটারকে বুঝতে হবে। জানতে হবে। অন্যথায় তাঁকে বিপদে পড়তে হবে।

ক্রেতারা কত দ্রুত তাঁদের ব্র্যান্ড পরিবর্তন করছে তার উৎকৃষ্ট উদাহরণ হতে পারে মোবাইল সেট। তীব্র প্রতিযোগিতার মধ্য দিয়ে বিভিন্ন কোম্পানি নতুন নতুন বৈশিষ্ট্যসম্বলিত সেট বাজারে ছাড়ছে। আর ক্রেতারা কেনার জন্য হুমড়ি খেয়ে পড়ছে। ক্রেতাদের এই যে ক্রয় আচরণের পরিবর্তন, রুচির পরিবর্তন, চাহিদার পরিবর্তন এগুলো নিয়ে মার্কেটারকে ভাবতে হবে। মার্কেটারকে গবেষণা করতে হবে। মার্কেটার যখন ক্রেতাদের চাহিদা পরিবর্তনের এই ধারাগুলো বুঝতে ব্যর্থ হচ্ছে তখন কোম্পানিকেও বিপদে পড়তে হচ্ছে। আমরা নোকিয়ার গল্প অনেকেই জানি। নব্বই দশকেও কোম্পানিটি বাজারে দাপটের সাথে ছিল। ক্রেতাদের পছন্দের তালিকায় ছিল নোকিয়া। কিন্তু ওই সময়ের জনপ্রিয় ব্র্যান্ডটি আজ বাজারে ধুঁকে ধুঁকে মরছে। এক সময় ফুজি এবং কোডাক ফিল্ম ছিল পুরো পৃথিবী জুড়ে বিখ্যাত ব্র্যান্ড। এই দুটি ব্র্যান্ডও সময়ের সাথে নিজেদের বদলাতে পারেনি।

প্রযুক্তিপণ্যের ক্ষেত্রে মার্কেটারকে আরও বেশি সচেতন হতে হবে। কারণ প্রযুক্তির পরিবর্তন এবং উন্নয়ন এতোটাই দ্রুত হচ্ছে যা মানুষ তাঁর কল্পনাশক্তি দিয়ে চিন্তাও করতে পারছে না। এ কারণে মার্কেটারকে তীক্ষ্ম দৃষ্টি ক্রেতার মনোভাবের প্রতি রাখতেই হবে। অন্যথায় যে কোনো সময় যে কোনো পণ্যের জন্য বিপদ এসে হাজির হতে পারে। প্রযুক্তি কোন দিকে যাচ্ছে, বিজনেস ট্রেন্ড কোন দিকে যাচ্ছে, ক্রেতাদের রুচির পরিবর্তন কেন হচ্ছে, কিভাবে হচ্ছে এই বিষয়গুলো একজন মার্কেটারকে সব সময় বোঝার চেষ্টা করতে হবে। যখন কোনো মার্কেটার বিজনেস ট্রেন্ড ধরতে ব্যর্থ হন তখন তিনি ব্যবসা হারিয়ে ফেলেন। ব্যবসা থেকে দূরে সরে যান।

ক্রেতার চাহিদা, রুচি, ক্রয়-আচরণ, কেনাকাটার ধরন সকল ক্ষেত্রেই পরিবর্তন দৃশ্যমান। এই পরিবর্তন কেন হচ্ছে এমন প্রশ্নের উত্তরে বলা যায়, মানুষের লাইফস্টাইল পরিবর্তন হয়ে যাচ্ছে। লাইফস্টাইল পরিবর্তনের পেছনে নানা কারণ কাজ করছে। আগের যে কোনো সময়ের তুলনায় মানুষ এখন শিক্ষার প্রতি অনেক বেশি আগ্রহী। মানুষ এখন দূর থেকে আরও দূরে চলে যাচ্ছে শিক্ষালাভ করার জন্য। মানুষ দু’হাতে টাকা খরচ করছে জ্ঞান অর্জনের জন্য। এই সংখ্যা হয়তো আমাদের প্রত্যাশার চেয়ে অনেক কম। কিন্তু মানুষ পড়ালেখা করছে। পড়ালেখা করতে গিয়ে মানুষ অনেক কিছু পড়ছে, শিখছে, জানছে।

উচ্চশিক্ষিত হওয়ার কারণে অনেকে ভালো চাকরি পাচ্ছে। রাতারাতি এর প্রভাব পড়ছে লাইফস্টাইলে। বাংলাদেশ অধিক জনসংখ্যার একটি দেশ। ফলে এদেশকে বিভিন্ন পণ্যের অনেক বড় একটি বাজার হিসেবে বিবেচনা করতেই হবে। এখানে ব্যবসা করার সুযোগ অনেক বেশি। কেউ ব্যবসা করছে, কেউ চাকরি করছে। দিনশেষে মানুষের ক্রয়ক্ষমতা বাড়ছে। ক্রয়ক্ষমতা বাড়লেই মানুষ আগের চেয়ে বেশি দামী পণ্যের প্রতি আকৃষ্ট হচ্ছে। তবে শুধু ক্রয়ক্ষমতা নয়, আরও নানা কারণে ক্রয়ের ধরন বদলে যাচ্ছে। মার্কেটারকে ক্রেতার পণ্য ক্রয়ের এই পরিবর্তনগুলো নিয়ে চিন্তাভাবনা করতে হবে। গবেষণা করতে হবে।

(চলবে)

ভাইস চ্যান্সেলর, মাওলানা ভাসানী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়, সাবেক চেয়ারম্যান মার্কেটিং বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়

শেয়ার করুন:

এই ক্যাটাগরির আরও নিবন্ধ

Global Before Footer