পর্ব- ১০
উদ্যোক্তা উন্নয়ন এবং বাস্তবতা
আমাদের দেশের উদ্যোক্তাদের আরও একটি সমস্যা হলো এদের মধ্যে উদ্ভাবনী চিন্তা-ভাবনার তীব্র অভাব। আমার এই লিখার মধ্যে যাঁরা ইতিমধ্যে উদ্যোক্তা হিসেবে আত্মপ্রকাশ করে নিজেদেরকে বড় পরিসরে নিয়ে গেছে তাঁরা অন্তর্ভুক্ত নয়। কারণ তাঁরা তাঁদের সফলতার গল্প অনেক আগেই লিখে ফেলেছে। আমার লিখার মধ্যে তাঁদের প্রসঙ্গটাই আসবে যাঁরা উদ্যোক্তা হওয়ার জন্য চেষ্টা করছে বা আগামীতে উদ্যোক্তা হিসেবে আত্মপ্রকাশ করবে। যাঁরা ক্ষুদ্র বা মাঝারী উদ্যোক্তা হিসেবে আত্মপ্রকাশ করতে চায় তাঁদের মধ্যে উদ্ভাবনী এবং সৃজনশীল চিন্তাÑভাবনার প্রচন্ড অভাব আমরা দেখতে পাই। ফলে আমাদের দেশে অনুসরণ এবং অনুকরণ করার মাত্রা অনেক বেশি পরিলক্ষিত হয়। যদি একজন উদ্যোক্তা কোনো কিছু নিয়ে উদ্যোগ গ্রহণের পর সফলতা পায় তাহলে তাঁর ওই একই পথে আরও দশ জন উদ্যোগ গ্রহণ করে। এরপর ওই একই পথে উদ্যোক্তাদের লাইন দীর্ঘ থেকে আরও দীর্ঘ হতে থাকে। এই দৃশ্যটি আমাদের দেশে খুব পরিচিত। কিন্তু এমন দৃশ্যের ফলাফল শেষ পর্যন্ত কখনো ভালো হয় না।
কারণ, অনেক উদ্যোক্তা একই পণ্য বা একই সেবা নিয়ে যখন বাজারে হাজির হয় তখন প্রত্যেকে নিজ নিজ পণ্য বা সেবা বিক্রি করতে গিয়ে তীব্র প্রতিযোগিতার সম্মুখীন হয়। তখন অধিকাংশ সময়ই বাজারে অস্বাস্থ্যকর প্রতিযোগিতা শুরু হয়। এই প্রতিযোগিতা এক সময় প্রত্যেক উদ্যোক্তার জন্যই কুফল বয়ে আনে। অথচ প্রত্যেক উদ্যোক্তা যদি নিজ নিজ অবস্থান থেকে উদ্ভাবন এবং সৃজনশীল ভাবনা নিয়ে কাজ করত তাহলে ক্রেতারা বাজার থেকে নতুন নতুন পণ্য কেনার সুযোগ পেত। বাজারে অসম প্রতিযোগিতা করার কেউ সুযোগ পেত না।
অনেকের মনে প্রশ্ন হতে পারে একজন ক্ষুদ্র উদ্যোক্তা যাঁর তেমন কোনো মূলধন নেই, অনেক ক্ষেত্রে হয়তো তেমন কোনো শিক্ষাগত যোগ্যতাও নেই, তাহলে এরা উদ্ভাবন ও সৃজনশীলতার মতো ব্যয়বহুল এবং বুদ্ধিবৃত্তিক কাজের সাথে নিজেদেরকে কীভাবে সংযুক্ত করবে। প্রশ্নটি অমুলক নয়। এমন প্রশ্ন অনেকের মনেই উদয় হতে পারে। এখানে আমাদের সকলেরই মনে রাখা প্রয়োজন উদ্যোক্তা হতে হলে মেধাবী হতে হবে। একটি চাকরি পেতে হলে যে ধরনের মেধা প্রয়োজন, উদ্যোক্তা হতে হলে তার চেয়ে অনেক বেশি মেধা প্রয়োজন। একজন বিজনেস গ্র্যাজুয়েট যদি প্রমাণ করতে পারে তাঁর মেজর কোর্সগুলোর ওপর ভালো পড়াশোনা আছে তাহলে তাঁকে একটি ভালো চাকরি পেতে তেমন কোনো বেগ পেতে হবে না।
মার্কেটিং নিয়ে পড়ালেখা করলে সেলস, মার্কেটিং বা ব্র্যান্ড ডিভিশনে চাকরি পাবে। হিসাববিজ্ঞান নিয়ে গ্র্যাজুয়েশন করলে প্রতিষ্ঠানের অ্যাকাউন্টস ডিভিশনে চাকরি পেতেই পারে। এইচআরএম নিয়ে পড়ালেখা করে প্রতিষ্ঠানের এইচআর ডিপার্টমেন্টে চাকরি পাবে। সিএসসি নিয়ে পড়ালেখা করে সফটওয়্যার ফার্মে বা কর্পোরেট প্রতিষ্ঠানের সাইবার সিকিউরিটি ডিপার্টমেন্ট বা আইটির সাথে সম্পৃক্ত অন্য কোনো ডিপার্টমেন্টে চাকরি পাবে এগুলো হলো সাধারণ ঘটনা। কিন্তু উদ্যোক্তা হিসেবে আত্মপ্রকাশ করতে হলে শুধু নিজের পঠিত বিষয়ের ওপর জ্ঞান রাখলেই হবে না, অন্যান্য বিষয় সম্পর্কেও জানতে হবে।
উদ্ভাবন এবং সৃজনশীল কাজগুলো ক্ষুদ্র উদ্যোক্তাদের পক্ষে করা সম্ভব এবং বাজেটের সীমাবদ্ধতা থাকা সত্ত্বেও করা সম্ভব। আমাদের মনে রাখতে হবে এই দুটি বিষয় যেখানে থাকবে না সেখানে ভালো কিছু আশা করা সম্ভব না। ক্রেতারা সব সময় তাঁদের ব্যয় করা অর্থ থেকে সর্বোচ্চ সুবিধা পেতে চাইবে এটাই স্বাভাবিক। বাজারে যদি সকলের পণ্য একই রকম হয় তাহলে ক্রেতারা কারও পণ্যকে বিশেষ গুরুত্ব দেবে না। কোনো ব্র্যান্ডের প্রতি আনুগত্য দেখাবে না। অনেকে পাট এবং পাটজাত পণ্য নিয়ে কাজ করছে। কেউ কেউ পাট দিয়ে কুটিরশিল্প গড়ে তুলছে। কিন্তু আমরা যদি একটু গভীরভাবে লক্ষ্য করি তাহলে দেখা যাবে সকলে প্রায় একই ধরনের পণ্য তৈরি করছে। পাটের ব্যাগ, পাটের টেবিল ম্যাট, পাটের ওয়াল ম্যাট, পাটের কার্পেট, পাটের শো-পিস, ইত্যাদি। প্রত্যেকের পণ্যগুলো এক জায়গায় জড়ো করলে বিশেষ কোনো পার্থক্য দেখা যাবে না।
একজন ক্ষুদ্র উদ্যোক্তার পণ্যের মধ্যে ভিন্নতা আনার জন্য গবেষণাগার স্থাপনের প্রয়োজন নেই। বিপুল অর্থ ব্যয় করে গবেষক নিয়োগ দেওয়ার প্রয়োজন নেই। এ ধরনের বিনিয়োগ তাঁর পক্ষে সম্ভবও নয়। কিন্তু তিনি ইচ্ছে করলে নতুন নতুন পণ্য তৈরির কথা ভাবতে পারেন। পণ্যের রঙ ও ডিজাইনে ভিন্নতার কথা চিন্তা করতে পারেন। পণ্য নিয়ে শিক্ষিতজনদের সাথে কথা বলতে পারেন। ইউনিভার্সিটির বিজনেস ফ্যাকাল্টির শিক্ষকদের সাথে আলাপ করতে পারেন। ইন্টারনেট ব্যবহার করে বিশে^র বিভিন্ন দেশের পাটের বিভিন্ন পণ্য সম্পর্কে তথ্য-উপাত্ত সংগ্রহ করতে পারেন। এরপর তিনি তাঁর পণ্যের ডিজাইন পরিবর্তন করতে পারেন। নতুন কোনো পণ্য তৈরির কথা চিন্তা করতে পারেন। কিন্তু সমস্যা হলো এই কাজগুলো করার জন্য যেটুকু চিন্তা এবং বুদ্ধিমত্তা থাকা প্রয়োজন আমাদের দেশের প্রান্তিক পর্যায়ের উদ্যোক্তাদের সেটা নেই। এমনকি উচ্চশিক্ষা লাভ করেছে এমন অনেকের মধ্যেও এই ভাবনাগুলো নেই। ফলে এদেশের অসংখ্য উদ্যোক্তা বিভিন্ন পণ্য ও সেবা নিয়ে উদ্যোগ গ্রহণ করার পর বাজারে টিকে থাকতে পারছে না। কারণ তাঁদের পণ্যগুলো ক্রেতাদের চাহিদা পূরণ করতে পারছে না। ক্রেতাদের আকর্ষণ করতে পারছে না। ক্রেতাদের ধরে রাখতে পারছে না। যদিও একজন উদ্যোক্তার পণ্যের মধ্যে বৈচিত্র্য বজায় রাখার জন্য গবেষণা এবং উন্নয়ন সংক্রান্ত পরিকল্পনা থাকা প্রয়োজন।
(চলবে)
চেয়ারম্যান, মার্কেটিং বিভাগ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়