Global Header Bottom
উদ্যোক্তা উন্নয়ন এবং বাস্তবতা

উদ্যোক্তা উন্নয়ন এবং বাস্তবতা

পর্ব- ১১

উদ্যোক্তা উন্নয়ন এবং বাস্তবতা

আজকের পর্বের মূল প্রতিপাদ্য বিষয় হলো অর্গানাইজেশনাল প্ল্যান বা সাংগঠনিক পরিকল্পনা। এই জায়গাটিতে আমার মনে হয় বাংলাদেশের যাঁরা উদ্যোক্তা তাঁদের জ্ঞানের স্বল্পতা এবং জানার ঘাটতি অনেক বেশি। আমি আগেও উল্লেখ করেছি এখানে মূলত যাঁরা নতুন উদ্যোক্তা হিসেবে আত্মপ্রকাশ করতে ইচ্ছুক বা যাঁরা ক্ষুদ্র উদ্যোক্তা হিসেবে নিজেদেরকে প্রতিষ্ঠিত করতে চায় তাঁদের জন্য দিকনির্দেশনামূলক লেখা হিসেবে এটাকে গ্রহণ করতে হবে। যাঁরা ইতোমধ্যে উদ্যোক্তা হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হয়েছেন তাঁদের জন্য এই লিখা নয়। তবে জানার বা শেখার কোনো শেষ নেই। এ কারণে যে কেউ এই লিখা থেকে জ্ঞান বা ধারণা লাভ করতে পারেন। যে কথাটি উল্লেখ করেছিলাম এদেশের নতুন উদ্যোক্তাদের মধ্যে অনেকেই সাংগঠনিক পরিকল্পনা সম্পর্কে ধারণা রাখেন না। এমনকি যাঁরা ক্ষুদ্র বা মাঝারি পর্যায়ের উদ্যোক্তা হিসেবে আত্মপ্রকাশ করেছেন তাঁদের মধ্যেও এই পরিকল্পনা নিয়ে জ্ঞানের এবং জানার স্বল্পতা রয়েছে। ফলে দেখা যায় এই পরিকল্পনার অভাবের কারণে ব্যবসা মাঝপথে থেমে যায়। কখনো কখনো বন্ধ হয়ে যায়। একটি সংগঠনের গঠন এবং এর পারিপাশি^র্ক বিষয়গুলো সম্পর্কে শুধু তাঁরাই জানেন যাঁরা এই বিষয় নিয়ে পড়াশোনা করেছেন বা এই বিষয় নিয়ে নিয়মিত কাজ করছেন।

এছাড়া অনেকে প্রশিক্ষণ গ্রহণ করেও এই বিষয় সম্পর্কে জ্ঞান এবং ধারণা লাভ করতে পারেন। ঢাকা শহর এবং অন্যান্য কয়েকটি প্রধান শহরে কিছু প্রতিষ্ঠান বিজনেস ডকুমেন্টেশন নিয়ে পরামর্শক হিসেবে কাজ করে। এই সকল প্রতিষ্ঠান থেকেও পরামর্শ নিয়ে একটি সংগঠন গড়ে তোলা এবং এর সাংগঠনিক দিক সম্পর্কে ধারণা লাভ করা যায়। কিন্তু বাস্তবতা হলো আমাদের দেশের প্রায় সকল উদ্যোক্তা এ ধরনের পরামর্শক প্রতিষ্ঠান থেকে কোনো ধরনের পরামর্শ গ্রহণ করতে ইচ্ছুক নয়। দুটি কারণে এমনটা হতে পারে। প্রথমত, উদ্যোক্তারা এ ধরনের পরামর্শ গ্রহণের প্রয়োজনীয়তা অনুধাবণ করতে পারেন না। দ্বিতীয়ত, এ ধরনের পরামর্শ গ্রহণ করতে গেলে ফি প্রদান করতে হয়। উদ্যোক্তারা এই কাজের জন্য কোনো ধরনের অর্থ ব্যয় করতে ইচ্ছুক নন।

আমরা জানি মালিকানার সূত্রে ব্যবসায়ের ধরন বিভিন্ন রকম হতে পারে। যেমন একমালিকানা, অংশীদারী, যৌথ মূলধনী, সমবায় সমিতি, ইত্যাদি। কিন্তু যাঁরা উদ্যোক্তা হিসেবে আত্মপ্রকাশ করতে ইচ্ছুক তাঁদের প্রথমেই চিন্তা করতে হবে কোন ধরনের ব্যবসা প্রতিষ্ঠান তাঁরা গড়তে চায়। ব্যবসায়ের কার্যধারা বিবেচনা করেও প্রতিষ্ঠানের মধ্যে রকমফের হতে পারে। কেউ হয়তো ট্রেডিং ব্যবসায়ের কথা চিন্তা করতে পারে। আবার কেউ হয়তো ম্যানুফ্যাকচারিং ব্যবসায়ের কথা চিন্তা করতে পারে। কিন্তু আমাদের একটি কথা মনে রাখতে হবে এখানে মূলত উদ্যোক্তা প্রসঙ্গে আলোচনা হচ্ছে। ফলে উদ্যোক্তারা কখনো ট্রেডিং বিজনেস করতে যায় না। তাঁরা সব সময় নতুন কিছু করার চেষ্টা করেন। চলমান কোনো পণ্য নিয়ে কাজ করলেও সেখানে কোনো না কোনো পরিবর্তন, পরিমার্জন করার চেষ্টা করেন। নতুবা সেটাকে উদ্যোক্তার কাজ বলা যাবে না।

উদ্যোক্তাদের সাংগঠনিক পরিকল্পনায় ব্যবস্থাপনার কাঠামো সম্পর্কে স্বচ্ছ ধারণা রাখতে হবে। কোন ধরনের ব্যবসায়িক কাঠামোতে ব্যবস্থাপনার ধরন কেমন হয় সেটা সম্পর্কে উদ্যোক্তাদের ধারণা রাখতে হবে এবং সে অনুযায়ী পরিকল্পনা করতে হবে। ব্যবসায় প্রতিষ্ঠানের ধরন বা কাঠামোর ওপর নির্ভর করবে ব্যবস্থাপনার ধরন কেমন হবে। যেমন একমালিকানা প্রতিষ্ঠান হলে উদ্যোক্তা নিজেই সর্বময় ক্ষমতার অধিকারী হতে পারেন। কিন্তু সেটা যদি অংশীদারী প্রতিষ্ঠান হয় তাহলে একক কোনো কর্তৃত্ব থাকে না। চুক্তি হলো অংশীদারী কারবারের মূল ভিত্তি।

এ কারণে চুক্তি অনুযায়ী অংশীদাররা তাঁদের দায়িত্ব, কর্তব্য পালন করবেন। আবার চুক্তি অনুযায়ী অংশীদাররা তাঁদের লাভ-লোকসান বন্টন করবেন। আবার যদি সেটা লিমিটেড কোম্পানি হয় তাহলে সেটার ব্যবস্থাপনার ধরন অন্য রকম। এ কারণে সাংগঠনিক পরিকল্পনা করার জন্য উদ্যোক্তাদের এ সম্পর্কে ভালো জ্ঞান ও ধারণা রাখতে হবে। এখানে একটি কথা মনে রাখা প্রয়োজন আমাদের দেশে অংশীদারী ব্যবসায়ের অভিজ্ঞতা ভালো নয়। অনেকে অংশীদারী ব্যবসায় শুরু করেন। কিন্তু শেষ পর্যন্ত ধরে রাখতে পারেন না। কোনো কোনো ক্ষেত্রে নির্মম পরিণতিও আমাদের দেখতে হয়েছে। এ কারণে সকল কিছু বিবেচনা করে উদ্যোক্তাদের সাংগঠনিক পরিকল্পনা করতে হবে।

বিভিন্ন ধরনের প্রতিষ্ঠানের জন্য বিভিন্ন ধরনের সরকারি বিধি-বিধান রয়েছে। আবার বিভিন্ন ধরনের প্রতিষ্ঠানের জন্য বিভিন্ন ধরনের সুযোগ-সুবিধাও রয়েছে। একজন উদ্যোক্তা যখন এই বিষয়গুলো সম্পর্কে জানতে এবং বুঝতে সক্ষম হন তখন তিনি তাঁর জন্য ভালো হয় এমন পথগুলোকে বেছে নিতে পারেন। কিন্তু এ সম্পর্কে তাঁর যদি যথেষ্ট জ্ঞান বা ধারণা না থাকে তাহলে তিনি ভালো কিছু গ্রহণ করা থেকে বঞ্চিত হতে পারেন। এখানে একটি কথা মনে রাখতে হবে উদ্যোক্তা কোনো উদ্যোগ গ্রহণ করার সময় সাংগঠনিক বিষয়গুলো সম্পর্কে যত বেশি ধারণা রাখতে পারবেন তিনি তত বেশি সুবিধা ভোগ করতে পারবেন। এক্ষেত্রে বিশেষভাবে উল্লেখ করতে হয় বিভিন্ন আইনের কথা। ব্যবসায় পরিচালনা করতে গেলে অনেক ধরনের আইনের সম্মুখীন হতে হয়। একজন উদ্যোক্তা কোনো আইনকে উপেক্ষা করতে পারেন না। কিন্তু তিনি যদি পূর্ব থেকে আইন সম্পর্কে ধারণা রাখেন তাহলে যে কোনো সিদ্ধান্ত নেওয়ার সময় সংশ্লিষ্ট আইনগুলোকে বিবেচনা করে সিদ্ধান্ত নিতে পারেন। এটা তাঁর জন্য অনেক বড় একটি সুবিধা।

(চলবে)

চেয়ারম্যান, মার্কেটিং বিভাগ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়

শেয়ার করুন:

এই ক্যাটাগরির আরও নিবন্ধ

Global Before Footer